কলকাতার বেহালায় শুরু হয়েছে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের বায়োপিক ‘দাদা’-র শুটিং। পরিচালক বিক্রমাদিত্য মোটওয়ানে নব্বইয়ের দশকের আবহে সৌরভ ও ডোনার কিশোর প্রেমের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছেন, যা পাড়াবাসীর মনে নস্টালজিয়া ফিরিয়ে এনেছে। 

ভোর তখন সবে ফিকে আলোয় ভরতে শুরু করেছে। বেহালার বীরেন রায় রোডে অদ্ভুত এক উত্তেজনা। দ্বিতীয় তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দুই বিনুনির এক কিশোরী। তার উৎসুক চোখ পাশের বাড়ির গেটের দিকে। পরনে সাদা স্কুলড্রেস। অপেক্ষা যেন শেষই হতে চাইছিল না।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

অবশেষে নির্দিষ্ট সময়েই গেট খুলে বেরিয়ে এল এক কিশোর। তার গায়েও স্কুলের সাদা পোশাক। সঙ্গে বেরোলেন ছেলেটির মা। মাকে হাত নেড়েই ছেলেটির চোখ গিয়ে থামল পাশের বাড়ির বারান্দায়। চার চোখের সেই মুহূর্তে যেন সময় থমকে দাঁড়াল। হুঁশ ফিরল মায়ের ধমকে—

“হাঁ করে কাকে দেখছিস?”

মেয়েটি দৌড়ে ঘরে ঢুকে গেল। ছেলেটি মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল রাস্তায়। আর এই দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে আবেগে ভেসে গেল গোটা পাড়া।

২৫ মে থেকে কলকাতায় শুরু হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটের মহাতারকা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়-র জীবনীভিত্তিক ছবি ‘দাদা’র শুটিং। বেহালার সেই পরিচিত পাড়াই যেন ফিরে পেল নব্বইয়ের দশকের সৌরভ-ডোনা প্রেমের দিনগুলো। পরিচালনায় বিক্রমাদিত্য মোটওয়ানে। সকাল থেকেই পরিচালক ও তাঁর টিম দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন পুরো এলাকা জুড়ে। কোথাও ক্যামেরা বসছে, কোথাও আলো, কোথাও আবার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

স্থানীয় বাসিন্দা মনোমিতা মুখোপাধ্যায়ের কথায়, এই দৃশ্য নাকি একেবারে বাস্তবের পুনর্নির্মাণ। সদ্য বিয়ে করে তিনি তখন ওই পাড়ায় এসেছেন। তাঁর শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে সৌরভের বাবা চণ্ডী গঙ্গোপাধ্যায়ের গভীর সম্পর্ক ছিল। সেই সূত্রেই কাছ থেকে দেখেছেন সৌরভ ও ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়-র কিশোর বয়সের প্রেমের শুরু।

সালটা ১৯৮৯। সৌরভ তখন একাদশ শ্রেণির ছাত্র, ডোনা নবমে। স্কুলড্রেস পরা সেই চোরাচোখে দেখা, বারান্দা থেকে অপেক্ষা— সবই নাকি ছিল বাস্তবের অংশ। মনোমিতার দাবি, পরিচালক যেন হুবহু ফিরিয়ে এনেছেন সেই সময়কে। এমনকি তাঁর চিকিৎসক স্বামী নাকি একসময় দু’জনের প্রেমপত্র পৌঁছে দেওয়ার কাজও করতেন!

শুধু আবেগ নয়, শুটিং সেটেও ছিল নিখুঁত সময়সফরের আয়োজন। রাস্তার পাশে তৈরি হয়েছে নকল সবজির দোকান, পুরনো দিনের চায়ের স্টল। মা মঙ্গলচণ্ডী ভবনের সামনে পুলিশ দাঁড়িয়ে— তাঁরা সত্যিই পুলিশ, নাকি ছবির চরিত্র, বোঝাই দায়। গোটা এলাকা যেন এক নিমেষে ফিরে গেছে নব্বইয়ের কলকাতায়।

এই আবহ আরও ঘন হয়ে উঠল অভিনেত্রী অপরাজিতা আঢ্য-র উপস্থিতিতে। চওড়া লাল পাড়ের সাদা শাড়ি, কোমরছোঁয়া বিনুনি, কপালে বড় সিঁদুরের টিপ— একেবারে বাঙালি গৃহবধূর চেহারায় তিনি অভিনয় করলেন সৌরভের মায়ের চরিত্রে। একাধিক শটে ছেলেকে ধমক দিতে দেখা গেল তাঁকে। প্রতিটি দৃশ্য মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলেন পরিচালক। শট শেষে অভিনেত্রীর সঙ্গে কথা বলে সন্তুষ্টির হাসিও দেখা গেল তাঁর মুখে।

ছবির শুটিং এখনও অনেকটাই বাকি। অভিনয়ে থাকছেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, রাজকুমার রাও, রাহুল দেব বসু এবং তান্যা মানিকতলা। কলকাতার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা— বিশেষ করে ইডেন গার্ডেন্স এবং সৌরভের বাড়িতেও হবে ছবির শুটিং।

বেহালার সেই ভোর তাই শুধুই শুটিংয়ের সকাল ছিল না। ছিল এক কিংবদন্তির প্রেম, বেড়ে ওঠা আর স্মৃতির দরজা খুলে যাওয়ার দিন।