বিশ্বের ক্রীড়া জগতে খুঁজলে মাত্র দুজন খেলোয়াড়কে পাওয়া যাবে, যাঁরা একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও ফুটবল - দুইই খেলেছেন। একজনন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ক্রিকেটার স্য়ার ভিভ রিচার্ডস, যিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি ১৯৭৪ সালে অ্য়ান্টিগা অ্যান্ড বারবুদা-র হয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের যোগ্যতা অর্জন পর্বেও খেলেছেন। আরেকজনন অস্ট্রেলিয়ার মহিলা ক্রিকেটার ও ফুটবলার এলিস পেরি। যিনি দুই মাঠেই সমান ছাপ ফেলেছেন। তবে এই তালিকায় প্রথম নামটা হতেই পারত এক বঙ্গ সন্তানের, তিনি চুনি গোস্বামী বা সুবিমল গোস্বামী।

বৃহস্পতিবার বিকেলে কলকাতা ময়দানে বড় শূন্যতা তৈরি করে তিনি পরলোক যাত্রা করেছেন। তাঁর মতো ফুটবলার হয়তো ভারত পাবে আগামী দিনেও কেউ কেউ তাঁকে ছাপিয়েও যাবে। ক্রিকেট মাঠেও তাঁকে টেক্কা দেবে অনেকে। কিন্তু তাঁর মতো পরিপূর্ণ খেলোয়াড়, ভারত কেন বিশ্বেও অত্যন্ত বিরল। তিনি যে একই সঙ্গে চুটিয়ে ক্রিকেট এবং ফুটবল খেলেছেন তাই নয়, ক্রিকেট  মাঠে আবার সমান দক্ষতা ছিল বলে এবং ব্য়াটে। এখানেই শেষ নয়, মোহনবাগান ক্লাবের হয়ে তিনি হকিও খেলেছেন, আর কলকাতার সাউথ ক্লাবে কয়েক বছর আগে পর্যন্তও নিয়মিত টেনিস খেলতেন তিনি।

১৯৩৮ সালে অবিভক্ত বাংলার কিশোরগঞ্জ জেলায় জন্ম হয়েছিল চুনি গোস্বামীর। তবে অল্প বয়সেই কলকাতায় এসে পড়েছিলেন তিনি। স্কুলের কোট শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কাছেই তাঁর ফুটবলে হাতেখড়ি হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে মাত্র ৮ বছর বয়সে মোহনবাগান ক্লাবের জুনিয়র দলে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৫৪ সালে উন্নিত হয়েছিলেন সিনিয়র দলে। তারপর থেকে ১৯৬৮ সালে ফুটবল ছাড়া পর্যন্ত ওই এক ক্লাবেই খেলে গিয়েছেন। ১৯৬০ থেকে ৬৪ টানা পাঁচ বছর সবুজ মেরুন ক্লাবকে নেতৃত্বও দেন।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। আর সেটা ছিল ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত, কারণ সেই ভারতীয় দল ১-০ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল অলিম্পিকে খেলা চিনা দলকে। তারপর থেকে চুণী ভারতীয় দলের জার্সিতে অলিম্পিক, এশিয়ান গেমস, এশিয়া কাপ, মারডেকা কাপ-সহ ৫০ টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। স্ট্রাইকারে খেলতেন, গোল করেছিলেন ১১টি। শুধু খেলাই নয়, তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় দল, ১৯৬২ সালের এশিয়ান গেমসে স্বর্ণপদক, ১৯৬৪ সালে এশিয়া কাপে আর মারডেকা কাপে রৌপ্যপদক অর্জন করেছিল।

তবে এই গোল, অধিনায়কত্ব, জয়-পরাজয় শুধুই শুকনো পরিসংখ্যান। সাধারণত লেফট ইনসাইড পজিশনে খেলতেন চুনি গোস্বামী। তাঁকে ফুটবল দুনিয়া মনে রাখবে বলের উপর তাঁর আসাধারণ নিয়ন্ত্রণের জন্য। তার থেকেও বোধহয় বেশি ফুটবল বোধের জন্য। মাঠে খেলা চলাকালীন খেলাকে বুঝতে পারার এক অসামান্য ক্ষমতা ছিল তাঁর।

এতো গেল ফুটবল মাঠের কথা। এবার আসা যাক ক্রিকেট মাঠে। বাংলার হয়ে প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট অর্থাৎ রঞ্জি ট্রফিতে তাঁর অভিষেক হয়েছিল ১৯৬২-মরসুমে। ডান হাতে মিডল অর্ডারে ব্য়াট করতেন, সেইসঙ্গে করতেন জোরে বল। অনেকে বলেন ১৯৫৪ সালে মোহনবাগান ফুটবল দলে সুযোগ না পেলে হয়তো চুনি ক্রিকেটই খেলতেন। আর ক্রিকেটটা মন দিয়ে খেললে ফুটবলার চুনিকেও ছাপিয়ে যেতে পারতেন ক্রিকেটার চুনি। কারণ ফুটবলের পিছনে তিনি যতটা সময় দিতেন, ক্রিকেটে তার অর্ধেকও দিতেন না। তাতেই যা সাফল্য পেয়েছিলেন, তা ঈর্শ্বনীয়।

১৯৬৮ সালে ফুটবল মাঠকে বিদায় জানানোর পর চুনি পুরো সময়ের জন্য মনোনিবেশ করেছিলেন ক্রিকেটে। ফল? ১৯৭২-৭৩ মরসুমে বাংলা দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। আর দলকে তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন ফাইনাল পর্যন্ত। সবমিলিয়ে সুবিমল চুনি গোস্বামী ৪৬টি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছিলেন। তাতে একটি শতরান-সহ ২৮.৪২ গড়ে ১৫৯২ রান করেছিলেন। সর্বোচ্চ স্কোর ছিল ১০৩ রান। এর পাশাপাশি বল হাতে তিনি ২৪.০৮ গড়ে দিয়ে ১১৩৪ রান দিয়ে ৪৭টি উইকেটও শিকার করেছিলেন। এমনকী জাতীয় দলের জন্যও তাঁর নাম বিবেচিত হয়েছিল বলে শোনা যায়। কিন্তু, সেই সময়ের বাংলার অনেক ক্রিকেটার-এর মতোই ক্রিকেট রাজনীতির শিকার হয়েছিলেন।

ফুটবল এবং ক্রিকেট দুই মাঠেই তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য, চুণী গোস্বামী স্বীকৃতিও কম পাননি। ১৯৬২ সালে, অর্থাৎ যেই বছর তাঁর রঞ্জি ক্রিকেটে অভিষেক এবং ভারতের এশিয়ান গেমসে সোনা জয়, সেই বছর তাঁকে এশিয়ার সেরা স্ট্রাইকার-এর সম্মান পেয়েছিলেন এই বিরল প্রতিভা। ১৯৬৩ সালে পেয়েছিলেন অর্জুন পুরষ্কার। আর ১৯৮৩ সালে তাঁকে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক পুরষ্কার পদ্মশ্রী সম্মান দিয়েছিল সরকার। আজীবন সব প্রলোভন ত্য়াগ করে মোহনবাগানের হয়ে খেলা চুণী গোস্বামীকে তাঁর ক্লাব মোহনবাগান রত্ন-এর সম্মান জানিয়েছিল ২০০৫ সালে।

তবে শুধু যে ক্রীড়াবিদ হিসাবেই চুণী গোস্বামীর পরিচয় তা তো নয়। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই বহুমুখী প্রতিভা। 'প্রথম প্রেম' নামে একটি বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন সুবিমল গোস্বামী। সেই সঙ্গে ২০০৫ সালে কলকাতার শেরিফের দায়িত্বও সামলেছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে বাংলার শুধু একজন ক্রীড়াবিদ নয়, হারালো এক আদ্যন্ত বাঙালী বহুমুখী বিরল প্রতিভাকে।