বিদেশী মিডিয়ায় দেখানো হচ্ছে কাশ্মীরের রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিল হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদী সরকারের দাবি দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া উপত্যকা প্রায় শান্ত। কারা ঠিক বলছে কারা ভুল এই নিয়ে জোর বিতর্ক চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। মূল বিতর্কটা বেধেছে আলজাজিরা ও বিবিসির প্রকাশিত দুটি ভিডিও নিয়ে। 'ইন্ডিয়া টুডে'র ফ্রেম বাই ফ্রেম বিশ্লেষণ ভিডিওটি ভুয়ো না আসল, অনেকটাই পরিষ্কার করে দিয়েছে।

বিদেশী মিডিয়ার দাবি

গত শুক্রবার নামাজ পড়ার জন্য উপত্যকায় কার্ফু অনেকটাই শিথিল করা হয়েছিল। কেন্দ্রের তরফে রাস্তায় অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ছবি তুলে ধরা হলেও বিদেশী মিডিয়ায় রিপোর্টে অন্য কথা বলা হয়েছে। বিবিসি ও আল জাজিরার প্রকাশ করা দুটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছে কয়েকহাজার স্থানীয় মানুষ রাস্তায় নেমে ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। ভারত-বিরোধী স্লোগান দিচ্ছেন। এমনকী কয়েকজনের হাতে জইশ ও মহম্মদের মতো জঙ্গি সংগঠনের পতাকাও রয়েছে। বিবিসির ভিডিওতে আবার দেখা যাচ্ছে তাদের সরাতে সেনা পেলেট ও কাদানে গ্যাস ছুড়ছে।

পাল্টা দাবি কী

কেন্দ্রের তরফে বিবৃতি দিয়ে সরাসরি বিবিসি আল জাজিরার রিপোর্টকে ভুয়ো বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নেটিজেনদের একাংশও ভিডিও দুটিকে ভুয়ো বলেই দাবি করছেন। কেউ কেউ বলছেন এটা পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ছবি। কেউ বলছেন পুরনো ভিডিও। অনেকেই যুক্তি দিচ্ছেন গত কয়েকদিন ধরে যেভাবে কড়া নিরাপত্তায় উপত্যকাকে মুড়ে রাখা হয়েছে তাতে এত মানুষ এক জায়গায় জড়ো হওয়ার সুযোগই পাবেন না। তাই ভিডিওদুটি অবশ্যই ফেক।

স্থান নির্ধারণ

ইন্ডিয়া টুডের তদন্তে প্রথমেই ভিডিওটি স্থান নির্ধারণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ভিডিওর একটি ফ্রেমে তারা একটি টিনের চাল ওয়ালা লাল রঙের বাড়ি দেখতে পেয়েছে। একই ফ্রেমে রাস্তার পাশের দেওয়ালের উপর লেখা রয়েছে মসজিদ উল রহমত। আর রয়েছে একটি বড় জলের ট্যাঙ্ক। প্রতিবাদ মিছিল আর একটু এগোতে সবুজ রঙের মসজিদটিও দেখা যায়। বিবিসি ও আল জাজিরা দাবি ভিডিওটি শ্রীনগরের। এরপর গুগল আর্থ প্রোতে শ্রীনগরে  উল রহমত মসজিদ খোঁজা হয়। যে মসজিদটি পাওয়া যায় তার একটু আগেই দেখা মিলেছে সেই লাল বাড়িটি ও জলের ট্যাঙ্কেরও। লাল বাড়িটি আসলে ট্রাস্টছ মেডিকেট হসপিটাল বলে জানিয়েছে গুগল প্রো। জায়গাটা হল শ্রীনগরের সৌর এলাকার দুলবাগ রোড। ওই এলাকাতেই গত কয়েকদিন ধরে প্রচুর সেনা মোতায়েনের খবর এসেছে।

শুধু এতেই থামা হয়নি জায়গাটি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও একটি সূত্রকে কাজে লাগিয়েছে ইন্ডিয়া টুডে। মিছিল আরও এগোতে একটি বাড়ির গায়ে 'টোরেটো' লেখা একটি নীল রঙের বোর্ড দেখতে পাওয়া যায়। এটি একচি মোবাইল অ্যাকসেসারিজ নির্মাণ সংস্থা, যাদের হেডঅফিস দিল্লিতে। দিল্লির অফিস থেকে জানানো হয়েছে শ্রীনগরের সৌরায় তাদের এক সেলস পার্টনার রয়েছে। কাজেই ভিডিওটি শ্রীনগরের, পাক অধিকৃত কাশ্মীরের নয় তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

সময় নির্ধারণ

ইন্টারনেটে তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও বিবিসি ও আলজাজিরার পোস্ট করার আগে এই ভিডিও দুটি কোথাও পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, ইন্টারনেটে আগে ভিডিওগুলি পোস্ট করা হয়নি। এবার প্রশ্ন হল ভিডিওগুলি আগে রেকর্ড করা কি না। কারণ, বিজেপি সরকার ৩৭০ ধারা তোলার আভাস দেওয়ার পর থেকেই এই বিষয়ে প্রতিবাদ উঠেছিল উপত্যকায়। বিবিসি ও আলজাজিরার দুটি ভিডিওতেই কয়েকজনকে একটি সাদা ব্য়ানার নিয়ে যেতে দেখা গিয়েছে। তবে ভিডিওদুটি আলাদা অ্য়াঙ্গেলে তোলা। ব্যানারে লেখা ছিল 'অ্যাব্রোগেশন অব আর্টিকল ৩৭০ ইস নট অ্যাক্সেটেবল ফর আস', অর্থাৎ ৩৭০ ধারা আমরা মেনে নিচ্ছি না। দুটি ক্ষেত্রেই ব্যানারে আর্টিকল বানানটি ভুল রয়েছে। এর থেকে বোঝা যায় দুটি ভিডিওই একই মিছিলের। কিন্তু এর থেকে ভিডিওটির প্রকৃত সময় বোঝা সম্ভব নয়।

শেষ কথা

অর্থাৎ, ভিডিওগুলি শ্রীনগরের এটা স্পষ্ট বোঝা গেলেও, ভিডিওগুলি কোন সময়ে তোলা তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। শুধু বলা যায়, ভিডিওগুলি আগে কখনও ইন্টারনেটে পোস্ট করা হয়নি। সাম্প্রতিক কালে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে একাধিকবার ভুয়ো ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু বিবিসির ভারতীয় দফতর থেকে সাফ জানানো হয়েছে তাদের প্রকাশিত খবর ও ভিডিওগুলি একেবারে সত্যি। আর ভিডিওগুলি তাদের নিজেদের প্রতিনিধিদেরই তোলা, কারোর কাছ থেকে সংগৃহিত নয়।