গেল শতকের পাঁচের দশকের কথা। সেবারই প্রথম পক্ষীবিদদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন বসেছে সুইডেনের উপসালাতে। প্রথম দিন অধিবেশন শুরুর আগেই সব দেশের প্রতিনিধিরাই হাজির হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু অধিবেশন শুরুর সময় হয়ে যাওয়ার পরও একজন অনুপস্থিত।তিনি ভারতীয় প্রতিনিধি। তার পৌঁছতে কেন দেরি হচ্ছে। সবাই চিন্তা করছেন। কোথায় আটকে গেলেন তিনি। সময় তো হয়েই গিয়েছে, তাহলে কি অনুষ্ঠান শুরু করে দেওয়া উচিত। আয়োজকরা যখন এই সব টুকরো টাকরা কথা বলাবলি করছেন ঠিক তখন আচমকা মোটরসাইকেলের গর্জন। একটি সানবীম মোটরসাইকেল ব্রেক কষে দাঁড়াল পক্ষীবিদদের প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। 
ওই মোটরসাইকেল চালিয়ে যিনি এসেছেন তিনি ভারতীয় প্রতিনিধি। তার জন্যই সবাই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি পৌঁছে গিয়েছেন। মুহূর্তের মধ্যে খবর চাউর হয়ে গেল যে ভারতীয় প্রতিনিধি বাইকে করে উপসালা পৌঁছেছেন। তিনি কি সোজা ভারত থেকে এখানে এলেন? এমন প্রশ্নও মুহুর্তে ছড়িয়ে গেল সেই সম্মেলনে। তবে চুয়ান্ন বছর বয়সী ভারতীয় পক্ষীবিদের হাজির হওয়াটা অনেকটাই সিনেমা হিরোর মতোই। তবে তিনি যে মোটরসাইকেল চালিয়ে এসেছেন তা নিয়ে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই ছিপছিপে চেহারার মানুষটির। ভারতীয় ওই পক্ষীবিদের নাম বার্ডম্যান সেলিম আলি।


সবুজের সংসার আর পাখি ছাড়া সেলিম আলি পাগল ছিলেন এই একটি বিষয়ে- মোটরসাইকেল। পারিবারিক ব্যবসার সূত্রে তিনি একসময় মায়ানমারে গিয়ে ছিলেন কিছুদিন। তখনই প্রথম তাঁর হাতে আসে একটি মোটরসাইকেল, সেটি ছিল জেনিথ। এরপর একে একে তিনি হার্লে ডেভিডসন,  ডগলাস,  স্কট,  নিউ হাডসন, মেক প্রভৃতি কোম্পানির মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। প্রায় সবকটি মডেল সংগ্রহশালার শোভাবর্ধণ করত। 
মোটরসাইকেলের শখ যেমন তেমন ছিল না। কোম্পানিগুলি বছর-বছর মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনে কোথায় কী নকশা বদলাচ্ছে, তা জানার জন্য তিনি মুখিয়ে থাকতেন। সেই কৌতূহল মেটাতে কোম্পানিগুলির মোটরসাইকেলের প্রায় সমস্ত জার্নাল আর প্রস্তুতকারকদের ক্যাটালগ সংগ্রহ করতেন। নতুন মোটরসাইকেল হাতে এলেই, তিনি তার ইঞ্জিন খুলে বোঝার চেষ্টা করতেন, কোম্পানি নতুন কী যন্ত্রপাতি তাতে দিল এবং কেন দিল। সপ্তাহে অন্তত দু-একটি দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যায় করতেন মোটরসাইকেলের ভিতর ও বাইরে পরিষ্কার করতে। তবে একটা আফসোস তাঁর আমৃত্যু ছিল- বিএমডব্লু-র মোটরসাইকেল। যেটি তিনি ব্যবহার করার সুযোগ পাননি।  
সেলিম আলির জীবনে প্রথম মোটরসাইকেলটি ছিল ৩.৫ এইচ পি এনএসইউ। পরবর্তীকালে একটি সানবিম এবং তিনটি আলাদা আলাদা মডেলের হার্লে ডেভিডসন, একটি ডগলাস, একটি স্কট একটি নিউহাডসন এবং একটি জেনিথ নিয়ে তিন তাঁর শখের সংগ্রহশালা সাজিয়ে ছিলেন। 


তবে সুইডেনের উপসালাতে সানবীমের গল্পটা পুরোপুরি সত্যি নয়। ভারত থেকে গোটা পথ তিনি ওই বাইকে পাড়ি দেননি। তিনি বম্বে থেকে জাহাজে করে বাইকটা ইউরোপে আনান। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সম্মেলনের আগে সেটাতে করে ইউরোপ চক্কর দেবেন। সুইডেনে আসার আগে তিনি সেই বাইক নিয়ে ফ্রান্স-জার্মানি প্রভৃতি দেশে ঘুরে বেড়িয়েছিলন। ফ্রান্সের রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্ট করেছিলেন, জার্মানির রাস্তায় গাড়ি নিয়ে উল্টে পড়েছিল হাতে পায়ে অল্প চোটও লেগেছিল, কিন্তু কোনও কিছুই তাঁর মোটরসাইকেল প্রীতিকে আটকাতে পারেনি। যতদিন পর্যন্ত নিজে হাঁটাচলা করতে পারতেন ততদিন পর্যন্ত এই বাইকগুলোই ছিল তাঁর ঘুরে বেড়ানোর পরম শান্তির বাহন।
ছোটবেলায় সেলিম স্বপ্ন দেখতেন প্রাণিবিজ্ঞানী হওয়ার, তবে বিষটা হতে হবে পাখি। কখনও ভাবতেন দুঃসাহসী অভিযাত্রী হবেন, তা নানলে দুর্ধর্ষ শিকারি হবেন। ছেলেবালার ওই সব ডাকাবুকো চিন্তা ভাবনার পিছনে অবশ্য একটা কারণ ছিল। খুব ছেলেবেলায় মা বাবাকে হারানোর পর তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন তার মামাকে, যার শখ ছিল শিকার। 
মামাবাড়িতে থাকাকালীন দেখতেন মাঝেমধ্যেই বাঁশের ঝাঁকায় করে আসত তিতির ও বটের পাখি। ছোট্ট সেলিম ঝাঁকার মধ্যের সেইসব পাখিদের মশগুল হয়ে দেখতেন। পরবর্তী ঝাঁকা থেকে পাখি সরিয়ে ফেলে প্যাকিং বাক্সের খাঁচা বানিয়ে তার মধ্যে পাখিগুলো রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এ ভাবেই তাদের দেখতেন।
ন’-দশ বছর বয়সে মামার কাছ থেকে এয়ারগান উপহার পাওয়ার পরে সেলিমের প্রিয় খেলা হল এয়ারগান দিয়ে চড়াই শিকার। এমনই এক দিন তাঁর চোখ আটকে গেল মরা একটি চড়াইয়ের গলার হলুদ রঙে। রহস্য উদ্ধার করতে গিয়েই বদলে গেল তাঁর জীবন। বদলে তাঁর হাঁটা চলা।