প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে তাঁর অন্যতম ভরসার কারণ ছিলেন অরুণ জেটলি। প্রথম পাঁচ বছরে নোটবাতিল, জিএসটি-র মতো একাধিক কঠিন পদক্ষেপ নেওয়ার কাজটা জেটলিক উপস্থিতির জন্যই অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল মোদী সরকারের কাছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জেটলির প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার কারণ খুঁজতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে ২০১২ সালে। কারণ দলের মধ্যে জেটলিই প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীকে তুলে ধরতে শুরু করেছিলেন। দলের একটি অংশের বিরোধিতা থাকলেও তাকে আমল দেননি অরুণ জেটলি। 

এখানেই শেষ নয়, শোনা যায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে প্রথম দু' মাস দিল্লির আমলাতন্ত্রের সঙ্গে সড়গড় হতে নরেন্দ্র মোদীকে সাহায্য করেছিলেন এই অরুণ জেটলিই। ২০১৩ সালে যখন বিজেপি-র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে লালকৃষ্ণ আডবাণীর নাম ভেসে ওঠে, তখন গোঁসা করে দিল্লিতে আসতে নারাজ ছিলেন গুজরাতের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই অরুণ জেটলিই তাঁকে বুঝিয়ে দিল্লিতে নিয়ে আসেন। 

আসলে দিল্লির রাজনীতি মোদী-শাহদের থেকে অনেকটাই অভিজ্ঞ ছিলেন অরুণ জেটলি। বাজপেয়ী মন্ত্রিসভার সদস্য থাকার সুবাদে প্রশাসনিক বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা ছিল তাঁর। কিন্তু দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব সামলে আরও দুঁদে রাজনীতিক হয়ে উঠেছিলেন বিখ্যাত এই আইনজীবী। খুব কাছ থেকে কংগ্রেসের পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়া এবং বিজেপি-র জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ার সাক্ষী ছিলেন তিনি। দলের মধ্যে তিনিই প্রথম কেন্দ্রে পরিবর্তনের আঁচ পেয়েছিলেন। 

আরও পড়ুন- থাকেননি বিয়েতে, নিজের বাড়িতে শেহবাগের বিয়ে দেন জেটলি

আরও পড়ুন- বিদেশ সফর বাতিল করবেন না, প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জেটলির পরিবারের

বাজপেয়ীর পর বিজেপি-তে আডবাণী যুগের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি-র মধ্যেও যে পরিবর্তন আনা দরকার, তা বুঝেই সম্ভবত শিবির বদলে লালকৃষ্ণ আডবাণীর বদলে নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেন জেটলি। সেই সময়ে দলের মধ্যে আডবাণী অনুগামী হিসেবে পরিচিত ভেঙ্কাইয়া নাইডু, সুষমা স্বরাজ, গোপীনাথ মুন্ডে এবং অনন্ত কুমারদেরও বোঝাতে সফল হন জেটলি। যার নিটফল নরেন্দ্র মোদীকে সামনে রেখেই ২০১৪ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। 

শুধু দলের মধ্যে মোদীকে সমর্থন করাই নয়, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে মোদীর ভাবমূর্তি ফেরাতেও তৎপর হন জেটলি। দুঁদে আইনজীবী হিসেবে পাল্টা যুক্তির জাল তৈরি করে তিনি মোদীর সমর্থনে প্রচারে নামেন। কংগ্রেস কীভাবে মিথ্যে অভিযোগ এনে মোদীর চরিত্রহনন করার চেষ্টা করছে, মানুষকে তা বোঝাতে মাঠে নেমে পড়েন অরুণ জেটলি। সংসদে বক্তৃতা রেখেই হোক অথবা ব্লগ লিখে বা সাংবাদিক সম্মেলন করে, নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে বিরোধীদের সমস্ত অভিযোগ ভোঁতা করে দেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধেই নিয়েছিলেন বিজেপি-র ক্রাইসিস ম্যানেজার। 

সম্ভবত এই কৃতজ্ঞতা থেকেই দ্বিতীয় মোদী মন্ত্রিসভায় জেটলিকে দফতরহীন মন্ত্রী করেও রাখতে মরিয়া ছিলেন নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু সেই প্রস্তাবে রাজি হননি জেটলি। আর ভাগ্যের পরিহাস এমনই, যে বিদেশ সফরে থাকার কারণে সেই অরুণ জেটলির শেষযাত্রাতেও থাকতে পারলেন না নরেন্দ্র মোদীকে। দূর থেকেই শ্রদ্ধা জানাতে হল নিজের বিপদের বন্ধুকে।