বিহারে আগামী ২৮ অক্টোবর  বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফা। তার আগে গত রবিবার এনডিএ জোট ভাঙল রামবিলাস ও চিরাগ পাসোয়ানের এলজেপি। দলীয় কোর কমিটির বৈঠকে লোক জনশক্তি পার্টির সিদ্ধান্ত কোনও অবস্থায় আর নীতীশ কুমারের নেতৃত্ব মানা সম্ভব হচ্ছল না। লোজপা সুপ্রিমো চিরাগ পাসোয়ান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা আছে। কিন্তু বিহারে এনডিএ জোটে আর লড়াই করা হবে না।
এনডিএ জানায় মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে জেডিইউ লড়বে ১২২ আসনে। বিজেপি ৯৫টিতে। অন্য সহযোগী লোক জনশক্তি পার্টির জন্য ২৫টি আসন ছাড়া হয়েছে। এতেই ক্ষোভ বাড়ে চিরাগ পাসেয়ানের। চিরাগ পাসোয়ান ঘোষণা করেন, তাঁর দল এলজেপি এবার এনডিএ জোটের শরিক হিসাবে ভোটে লড়বে না। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের কয়েকটি সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তাই এনডিএ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু বিজেপির সঙ্গে তাঁর কোনও বিরোধ নেই।  
এলজেপি ভোটে নীতীশ কুমারের জেডি (ইউ)-এর বিরুদ্ধে প্রার্থী দেবে। কিন্তু বিজেপির বিরুদ্ধে প্রার্থী দেবে না। রাজনীতিক মহলের ধারণা, চিরাগের এই সিদ্ধান্তের পিছনে বিজেপির সমর্থন আছে। নীতীশ কুমারের বিরুদ্ধে চিরাগ কড়া সমালোচনা করার পরও বিজেপি কোনও প্রতিক্রিয়া জানায় না। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তারা আগেই জানিয়ে দিয়েছে, বিহারে এনডিএ-র মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হচ্ছেন নীতীশ।
অন্যদিকে বিরোধীদের তরফে এবার মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হচ্ছেন আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব। রাজ্যের ২৩০ টি বিধানসভা আসনের মধ্যে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদবের ছেলে তেজস্বীর দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে ১৪৪ টিতে। তাঁদের জোটশরিক কংগ্রেসকে দেওয়া হয়েছে ৭০ টি আসন। বাম দলগুলি লড়বে ২৯ আসনে। আরজেডি-র ২৩০ টি আসনের মধ্যে কয়েকটি ছেড়ে দেওয়া হবে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চাকে।বিরোধীদের এই আসন ভাগাভাগিতে অসন্তুষ্ট হয়েছে ভিআইপি পার্টি নামে একটি ছোট দল। তারা বিরোধী জোট ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। 


আসন ভাগাভাগি নিয়ে দর কষাকষি চলছিল শুরু থেকেই। কিন্তু জোট যাতে ভেঙে না যায় তার জন্যে সব ধরণের চেষ্টা ছিল বিজেপি তরফে। গত বছর ঝাড়খণ্ডে একলা চলো নীতির জেরে বিজেপিকে হারতে হয়েছিল। মহারাষ্ট্রেও মুখ্যমন্ত্রিত্ব নিয়ে বিবাদের জেরে দীর্ঘদিনের বন্ধু শিবসেনার হাত ছাড়তে হয়।পর পর দুটি ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়েই বিহারে এগোতে চেয়েছিল গেরুয়া শিবির। যে কারণে দেবেন্দ্র ফড়নবিশকে বিহার নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নানাভাবেই বিহারে বিধানসভা নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষার মরশুমে বিহারের ১৮টি জেলা বন্যা কবলিত। তাছাড়া করোনার আবহে বিহারে বিধানসভা নির্বাচন। গত কয়েকমাসে বিহারে ফিরেছেন ৩০ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক। যাদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে বিরোধীদের রোষের মুখে পড়তে হয়েছিল নীতীশ কুমারকে। কর্মসংস্থান চিরকালই বিহারের জন্য একটি মাথা ব্যথার কারণ। এর জেরেই এত সংখ্যক মানুষকে পরিযায়ী শ্রমিক হতে হয়।

 
বিহারে এবার বিহারে নীতিশ-বিজেপি জোটকে লড়তে হবে কংগ্রেস-আরজেডি  মহাজোটের বিরুদ্ধে।এই লড়াই মোটেও সহজ নয়। তার ওপর উত্তরপ্রদেশের হাথরসের ঘটনা রীতিমতো বিহারের দলিত সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। দলিত অধ্যুষিত বিহারের অধিকাংশ জায়গায় হাথরসের ঘটনায় ক্ষোভ বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে পাল্টাতে পারে রাজনৈতিক সমীকরণ। দলিত সম্প্রদায়ের মেয়ের ওপর যে ঘটনা ঘটেছে, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বিহারের দলিত অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। ফলে বিজেপি জোটের কাছে এ ঘটনা হয়ে উঠতে পারে অশনি সংকেত। 
উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতাসীন বিজেপি পরিচালিত যোগী আদিত্যনাথ সরকারের ওপরেই গোটা ঘটনার দায় বর্তেছে। বিশেষ করে হাথরসে নির্যাতিতার মৃত্যুর পর যেভাবে পুলিশ প্রশাসন বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং যেভাবে ন্যক্কারজনকভাবে কংগ্রেস এবং তৃণমূলের প্রতিনিধিদের আটকানো হয়েছে, তা নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভ বাড়ছে। তার ওপর সংবাদমাধ্যমকে যেভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে বিশেষ করে মহিলা সাংবাদিকদের প্রতি পুলিশের যে ব্যবহার তার নিন্দায় সরব হয়েছে দেশবাসী। ফলে উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকারের ওপর যেমন চাপ বেড়েছে, তেমনি ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে বিজেপিরও। 
রাজনৈতিক মহলের ধারণা বিহারের বিজেপি শিবির রাজনৈতিক ভাল অবস্থানে থাকলেও হাথরসের ঘটনা অনেকটাই ধাক্কা দিতে পারে। বিরোধী শিবির ইতিমধ্যে হাথরসের ঘটনাকে সামনে এনে বিজেপিকে তুলোধুনো করছে। বিহারের দলিত সম্প্রদায়ের ভোটাররা হাথরসের ঘটনাকে নিজেদের জীবনের প্রতিফলন হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। ফলে এবার দলিত ভোটারদের বিজেপিরমন পাওয়া বেশ কষ্টের হবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।