ট্রেন টিকিট ক্যানসেল বা ট্রেন লেট হলে রিফান্ড থেকে রেলওয়ের নিয়ম কি? কত দিন আগে ভাড়া ক্যানসেল করলে টাকা পাওয়া যায়, এখানে সহজ ভাষায় সম্পূর্ণ তথ্য জানুন।

ভারতের রেল ব্যবস্থা শুধু পরিবহণের মাধ্যম নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক ভরসার নাম। চাকরির কাজে ভিনরাজ্য যাওয়া হোক, সন্তানের পরীক্ষা দিতে শহর ছাড়া, কিংবা চিকিৎসার জন্য বড় হাসপাতালে পৌঁছনো— প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ রেলের উপর নির্ভর করেন। ডিজিটাল ব্যবস্থার কারণে এখন ট্রেনের টিকিট কাটাও আগের তুলনায় অনেক সহজ। IRCTC-র অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে কয়েক ক্লিকেই বুকিং সম্পন্ন হয়ে যায়। কিন্তু পরিকল্পনা সব সময় পরিকল্পনামাফিক চলে না। হঠাৎ অসুস্থতা, কাজের পরিবর্তন, কিংবা ট্রেনের দীর্ঘ বিলম্ব— নানা কারণে যাত্রা বাতিল করার প্রয়োজন পড়ে। 

তখনই যাত্রীদের মনে ঘুরপাক খায় একটাই প্রশ্ন— চার্ট তৈরি হয়ে যাওয়ার পরেও কি টিকিটের টাকা ফেরত পাওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই নির্ভর করে পরিস্থিতির উপর। ভারতীয় রেল টিকিট ক্যানসেলেশন ও রিফান্ডের জন্য একাধিক নিয়ম নির্ধারণ করেছে, যা না জানলে অনেক সময় যাত্রী নিজের প্রাপ্য টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ হারান। রেলের নিয়ম অনুযায়ী, ট্রেনের চূড়ান্ত যাত্রী তালিকা বা চার্ট তৈরি হওয়ার আগে যদি টিকিট ক্যানসেল করা হয়, তাহলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই টাকা ফেরত পাওয়া যায়। তবে পুরো টাকা নয়। রেল কিছু নির্দিষ্ট ক্লার্কেজ চার্জ কেটে নেয়। এই চার্জ টিকিটের শ্রেণি অনুযায়ী আলাদা হয়। 

সাধারণ বা সেকেন্ড ক্লাসে কাটছাঁট কম হলেও, স্লিপার ও এসি ক্লাসে সেই অঙ্ক তুলনামূলক বেশি। বাকি অর্থ সাধারণত যাত্রীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ফেরত আসে। তবে এমন কিছু পরিস্থিতি রয়েছে, যেখানে চার্ট তৈরি হয়ে যাওয়ার পরেও যাত্রী সম্পূর্ণ রিফান্ড পেতে পারেন। যেমন— যদি কোনও কারণে রেল কর্তৃপক্ষ পুরো ট্রেনটাই বাতিল করে দেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রযুক্তিগত সমস্যা বা অপারেশনাল কারণে ট্রেন বাতিল হলে যাত্রীদের টিকিটের পুরো টাকা ফেরত দেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে IRCTC নিজে থেকেই রিফান্ড প্রসেস শুরু করে দেয়, যদিও কিছু ক্ষেত্রে যাত্রীকে আলাদা করে TDR (Ticket Deposit Receipt) দাখিল করতে হয়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হল ট্রেনের দেরিতে চলা। যদি নির্ধারিত সময়ের তুলনায় ট্রেন তিন ঘণ্টা বা তার বেশি দেরিতে ছাড়ে এবং যাত্রী সেই কারণে যাত্রা না করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তিনি সম্পূর্ণ রিফান্ড পাওয়ার অধিকারী। তবে এখানে একটি শর্ত রয়েছে— যাত্রী যদি একবার ট্রেনে উঠে পড়েন, তাহলে আর পুরো টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না। এই ধরনের ক্ষেত্রে রিফান্ড পেতে হলে IRCTC-র ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপে লগইন করে ‘File TDR’ অপশনে আবেদন করতে হয়। আবেদন জমা পড়ার পর রেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি যাচাই করে এবং নিয়ম অনুযায়ী রিফান্ড মঞ্জুর হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা ফেরত পাঠানো হয়। প্রসঙ্গত, ট্রেন ছাড়ার সাধারণত ৪ ঘণ্টা আগে রেলের রিজার্ভেশন চার্ট তৈরি হয়। 

চার্ট হয়ে গেলে অনেক যাত্রীই মনে করেন টিকিট ক্যানসেল করলে আর টাকা ফেরত পাওয়া যায় না। কিন্তু বাস্তবে ট্রেন বাতিল, দীর্ঘ বিলম্ব বা নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় পড়লে চার্টের পরেও রিফান্ড পাওয়ার সুযোগ থাকে। এই ক্ষেত্রে যাত্রীকে IRCTC বা রেলের নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদন করতে হয়। আবেদন গৃহীত হলে রিফান্ডের টাকা সাধারণত ৭–১০ কর্মদিবসের মধ্যে অ্যাকাউন্টে জমা হয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রেনের টিকিট ক্যানসেল বা রিফান্ড নিয়ে বিভ্রান্তির মূল কারণ নিয়ম না জানা। চার্ট তৈরি হয়ে গেলেই যে সব ক্ষেত্রে টাকা ফেরত পাওয়া যায় না, এমন নয়। পরিস্থিতি বুঝে সঠিক সময়ে আবেদন করলে অনেক ক্ষেত্রেই যাত্রী নিজের প্রাপ্য অর্থ ফেরত পেতে পারেন। বিশেষ করে ট্রেন বাতিল হওয়া বা দীর্ঘ বিলম্বের মতো ক্ষেত্রে রেল যাত্রীদের সুরক্ষার কথা ভেবেই সম্পূর্ণ রিফান্ডের ব্যবস্থা রেখেছে। তবে মনে রাখতে হবে, এই সুবিধা পেতে হলে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সঠিক পদ্ধতিতে আবেদন করা জরুরি। 

TDR ফাইল না করলে বা দেরিতে আবেদন করলে রিফান্ডের সুযোগ নষ্ট হতে পারে। পাশাপাশি কোন শ্রেণির টিকিটে কতটা চার্জ কাটা হয়, কোন ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ভাবে টাকা ফেরত আসে— এই তথ্যগুলি আগে থেকে জানা থাকলে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি কমে। ডিজিটাল বুকিংয়ের যুগে যাত্রীরা যেমন দ্রুত টিকিট কাটতে পারছেন, তেমনই নিয়ম না জানলে সহজেই ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাই সফরের আগে শুধু ট্রেনের সময়সূচি নয়, রিফান্ড সংক্রান্ত নিয়মগুলিও একবার দেখে নেওয়া বুদ্ধিমানের। সচেতন যাত্রী হওয়াই শেষ পর্যন্ত সুরক্ষিত ও ঝঞ্ঝাটহীন যাত্রার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।