অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলায় ভারতের ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে চিনা সেনা। সম্প্রতি সীমান্ত এলাকা ঘুরে এসে এমনই বিস্ফোরক দাবি করেছেন অরুণাচল প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি বোসিরাম সিরাম। তাঁর দাবি, চিনা সেনার আগ্রাসনের জেরে স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

অরুণাচল প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি তথা প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী বোসিরাম সিরাম এক বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, আপার সুবনসিরি জেলায় ভারতের ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে চিনা সেনা। যদিও এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তবে কংগ্রেসের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল সম্প্রতি সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছিল। সিরাম সেই সফরের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়েই সাংবাদিক বৈঠকে এই দাবি করেন।

বোসিরাম সিরামের নেতৃত্বে কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধি দল গত ২৬ থেকে ২৯ আগস্ট সীমান্ত এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সফর করে। এই দলে ছিলেন কার্যকরী সভাপতি তথা প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঙ্গা বাইলিং এবং আপার সুবনসিরির সাংসদ জারোদুম ক্রি। সিরাম বলেন, "ভারত-চিন সীমান্তে চিনা অনুপ্রবেশ এবং বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনের সময় দেখেছি, পরিস্থিতি খুব সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখা দরকার।" প্রতিনিধি দলটি ইটানগর থেকে নাচো হয়ে লাইমেকিং এবং তাকসিং পর্যন্ত ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে। সিরাম জানান, চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) আগ্রাসী মনোভাব ও কার্যকলাপের জেরে স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং ঐতিহ্যবাহী জীবিকা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সিরাম চিনা সেনার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের চলাফেরায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে বলেন, "স্থানীয়রা আগে যেখানে ইয়াক চরাতে, খাবার সংগ্রহ করতে বা শিকার করতে যেতেন, এখন আর সেখানে স্বাধীনভাবে যেতে পারছেন না।" সিরামের দাবি, সীমান্তের একাধিক জায়গায় ভারত ও চিনা সেনার মধ্যে এখনও সংঘাতের পরিস্থিতি রয়েছে। এর ফলে নিয়মিত টহলদারি এবং স্থানীয়দের যাতায়াত বাধা পাচ্ছে। তিনি জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে জানান, ওই সময় দুই দেশের সেনার মধ্যে হাতাহাতি ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটেছিল। তবে ভারতীয় বাহিনী সফলভাবে চিনা আগ্রাসনের কড়া জবাব দেয়।
সিরাম দাবি করেন, "স্থানীয়রা জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে আমাদের এই ধরনের সংঘর্ষের কথা জানিয়েছিলেন। দুই পক্ষের সেনাই একে অপরকে লাঠি দিয়ে আক্রমণ করে এবং হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে বলে খবর পাওয়া যায়। ভারতীয় সেনাও চিনা সেনার আগ্রাসী কার্যকলাপের পাল্টা জবাব দেয়।"

তিনি ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধে হাবিলদার শের থাপার অসামান্য বীরত্ব এবং দৃঢ় প্রতিরোধের কথা স্মরণ করে তাঁকে শ্রদ্ধাও জানান।
অরুণাচল কংগ্রেসের প্রধান সীমান্তের ওপারে চিনের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে তুলনা টেনে জানান, দুর্গম এলাকায় মোতায়েন থাকা ভারতীয় সেনারা চরম লজিস্টিক সমস্যার মুখে পড়ছেন। জওয়ানরা ২৪ ঘণ্টা মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবা না থাকায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন। এছাড়া নিয়মিত খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহের ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

তিনি বলেন, "কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অবিলম্বে সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং স্থানীয়দের অধিকার, জীবিকা ও ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলো রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সীমান্ত এলাকায় রাস্তাঘাট, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য মৌলিক পরিকাঠামো আরও মজবুত করতে হবে। স্থানীয়দের অভাব-অভিযোগগুলোকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।" সিরাম সব আবহাওয়ায় ব্যবহারযোগ্য রাস্তা, শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তারক্ষীদের জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধার ওপর জোর দেন।

সিরাম বলেন, "চিনের দিকে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিকাঠামো অনেক ভালো। আমাদেরও সীমান্ত এলাকায় সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। সীমান্ত পর্যন্ত সব আবহাওয়ায় ব্যবহারযোগ্য রাস্তা, সার্বক্ষণিক মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবা এবং আমাদের সেনাদের জন্য আরও ভালো সুযোগ-সুবিধা থাকাটা অত্যন্ত জরুরি।"

তিনি স্থানীয় যুবকদের অগ্রাধিকার দিয়ে একটি আলাদা 'অরুণাচল রেজিমেন্ট' তৈরির পক্ষেও জোরালো সওয়াল করেন। তাঁর যুক্তি, স্থানীয় যুবকরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং ভৌগোলিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খুব ভালো করে জানেন, যা দেশের সীমান্ত নিরাপত্তায় দারুণ কাজে আসবে। তিনি বলেন, "আমাদের যুবকরা স্থানীয় ভূগোল এবং পাহাড়ি এলাকা সম্পর্কে খুব ভালো করে জানেন। তাঁরা সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন। রাজ্যের যুবকদের অগ্রাধিকার দিয়ে একটি অরুণাচল রেজিমেন্ট তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।"

সিরাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অনুপ্রবেশের দাবি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলেন, "সীমান্তে যদি কোনও অনুপ্রবেশ বা আগ্রাসী কার্যকলাপ না-ই ঘটে থাকে, তাহলে স্থানীয়রা কেন বারবার এই অভিযোগ তুলছেন? এই অভিযোগগুলোকে নিছক গুজব বলে উড়িয়ে না দিয়ে, একটি নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হওয়া উচিত।" তিনি আরও অভিযোগ করেন, উপরাষ্ট্রপতি সিপি রাধাকৃষ্ণণ যখন অরুণাচল প্রদেশ সফরে এসেছিলেন, তখন কংগ্রেসের প্রতিনিধি দল তাঁর সঙ্গে দেখা করার সময় চেয়েছিল। তাঁরা সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে তাঁকে জানানো এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনার জন্যই এই সাক্ষাতের আর্জি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

সিরাম বলেন, "সীমান্ত পরিস্থিতির মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে দেখা করার অনুমতি না দেওয়াটা ঠিক নয়। সব পক্ষের কথাই শোনা উচিত, যাতে আসল পরিস্থিতিটা বোঝা যায় এবং সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায়।" সিরাম ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) ডিরেক্টর জেনারেল শত্রুজিৎ সিং কাপুরের সাম্প্রতিক বিবৃতির কথাও উল্লেখ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্থানীয়রা যে বাস্তব পরিস্থিতির কথা জানাচ্ছেন, তার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের একটি স্বচ্ছ এবং উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত করা উচিত।