রবিবার নয়াদিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার বাইরে বিক্ষোভ দেখান ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) নেতা সৌরভ দাস। এক মহিলা সাংবাদিককে শ্লীলতাহানির অভিযোগে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের দাবি তুলেছেন তিনি।

রবিবার নয়াদিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার বাইরে তুমুল বিক্ষোভ হয়। এক মহিলা সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন, বিক্ষোভ চলাকালীন দিল্লি পুলিশের কর্মীরা তাঁর শ্লীলতাহানি ও যৌন হেনস্থা করেছে। এই ঘটনায় এফআইআর দায়েরের দাবিতে সরব হয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস।

সৌরভ সিজেপি-র লিগ্যাল টিমের প্রধান রত্না সিং, অভিযোগকারিণী এবং তাঁর আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে থানার বাইরে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। পুলিশ কেন তাঁদের সঙ্গে দেখা করছে না, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। সৌরভ জানান, তাঁরা জবাবের অপেক্ষায় বসে আছেন।

দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে সরব সৌরভ দাস

বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে সৌরভ বলেন, "অভিযোগকারিণী এখানে আছেন। তাঁর আইনজীবী এবং আমরাও আছি। ওরা আমাদের সঙ্গে কথা বলছে না কেন? আমরা ওদের দু-তিন মিনিট সময় দিয়েছি। নাহলে আমরা সোজা ভিতরে ঢুকে যাব।"

সৌরভ জানান, তিনি আর রত্না সিং ওই নির্যাতিতাকে সমর্থন করতেই পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় এসেছেন। তাঁর অভিযোগ, দিল্লি পুলিশ ওই মহিলার সঙ্গে একেবারেই সহযোগিতা করছে না।

তিনি বলেন, "আজ ককরোচ জনতা পার্টির তরফ থেকে আমি আর রত্না সিং নির্যাতিতার পাশে দাঁড়াতে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় এসেছি। আপনারা জানেন, দেশের যুবসমাজ এখানে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। আর দিল্লি পুলিশ কী নির্মমভাবে তাদের আটক করছে, মারধর করছে, তা গোটা দেশ দেখছে। দিল্লি পুলিশের নিজেদের আচরণের জন্য লজ্জিত হওয়া উচিত। বিশেষ করে ২০ জুলাইয়ের সেই বর্বরতার পর ওরা ঠিক এভাবেই আচরণ করছে।"

দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে FIR মহিলা সাংবাদিকের

সৌরভ আরও বলেন, "নির্যাতিতা শুধু একটা এফআইআর দায়েরের দাবি জানাচ্ছেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনে খুব স্পষ্ট নিয়ম আছে। কোনও মহিলা বা যে কেউ যখন কোনও গুরুতর অপরাধের অভিযোগ জানাতে আসেন, তখন এফআইআর দায়ের করা পুলিশের প্রাথমিক কর্তব্য। কিন্তু আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন, পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় দিল্লি পুলিশ নির্যাতিতার সঙ্গে একটুও সহযোগিতা করছে না।"

তাঁর অভিযোগ, পুলিশ এসিপি বিবেক ভগতকে 'আড়াল করে বাঁচানোর' চেষ্টা করছে। সৌরভ বলেন, "নির্যাতিতা শ্লীলতাহানি ও যৌন হেনস্থার মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। আর ওরা নিজেদের এসিপি বিবেক ভগতকে আড়াল করছে। অন্তত একটা এফআইআর তো দায়ের করা উচিত, কিন্তু দিল্লি পুলিশ সেটাও করতে চাইছে না।"

সৌরভ আরও বলেন, "এর ফলে নির্যাতিতা ইন্ডিয়া গেট থেকে শুরু হওয়া মিছিলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নেতাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি ন্যায়বিচারের দাবিতে ওই মিছিলে হাঁটবেন। ককরোচ জনতা পার্টি এই বিষয়টিকে পুরোপুরি সমর্থন করে। দেশের যুবসমাজের ওপর এমন বর্বরতা আমরা কিছুতেই মেনে নেব না। উর্দির আড়ালে থাকা এই দানব পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে। আমরা চাই খুব দ্রুত এই পদক্ষেপ করা হোক। আমরা এই দাবি তুলব, আর যে সংগঠনগুলো এভাবে মিছিল করছে, তারাও এই দাবি তুলবে। আমরা নির্যাতিতার পাশে আছি।"

CJP-র লিগ্যাল টিমের প্রধান রত্না সিং-এর দাবি

সিজেপি-র লিগ্যাল টিমের প্রধান রত্না সিং জানান, ওই মহিলা সাংবাদিক এক পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানি ও মারধরের অভিযোগ তুলেছেন। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখার জন্য পুলিশকে সময় দেওয়া হলেও তারা এফআইআর দায়ের করেনি বলে অভিযোগ রত্নার।

রত্না বলেন, "নির্যাতিতা অভিযোগ করেছেন যে পুলিশ আধিকারিক তাঁর শ্লীলতাহানি ও মারধর করেছেন। কাল রাত দেড়টা পর্যন্ত আমরা থানায় ছিলাম। তখনও আমাদের শুধু একটা সময় দেওয়া হয়েছিল। ওরা সময় চেয়েছিল, আর আমরা আজ দুপুর ১২টা পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এফআইআর দায়ের করার সময় দিয়েছিলাম। সেই সময় পেরিয়ে গেছে। এখন বিকেল সাড়ে ৩টে বাজে। এখনও কোনও এফআইআর হয়নি। ভিতরে কোনও অফিসার নেই, কেউ আমাদের কথা শুনছেও না।"

তিনি আরও বলেন, "কেউ আমাদের কথা শুনছে না দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমরা মিছিল করে নিজেদের দাবি জানাব।"

বিক্ষোভে CPI(M)

সিপিআই(এম) নেত্রী বৃন্দা কারাতও এই বিক্ষোভে যোগ দেন। যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, পুলিশ সেই অফিসারকে আড়াল করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বৃন্দা কারাত বলেন, "দেখুন, ইন্ডিয়া গেট থেকে মিছিল শুরু হতে চলেছে। আসল ব্যাপারটা হল, আজ এই থানার একটাই কাজ বলে মনে হচ্ছে—একজন যৌন হেনস্থাকারীকে বাঁচানো। ওরা একজন যৌন হেনস্থাকারীকে আড়াল করছে। কোনও মহিলার অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের করা বাধ্যতামূলক করতে আমরা বছরের পর বছর লড়াই করে আইন তৈরি করেছি। আর এই ক্ষেত্রে ওরা সেই পুরো আইনি কাঠামোটাকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।"

তিনি আরও বলেন, "ওরা এসিপি-কে আড়াল করার চেষ্টা করছে। আমি দিল্লির সব মহিলাদের কাছে আবেদন করছি, ওরা আমাদের এতদিনের লড়াইকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে, আমাদের সব চেষ্টাকে মাটি চাপা দিচ্ছে।"

এফআইআর দায়ের করার আগে পুলিশের ভিডিও প্রমাণ চাওয়ার অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বৃন্দা। তিনি বলেন, "একটা মেয়ে অভিযোগ জানালে কেন এফআইআর দায়ের হবে না? পুলিশ এখন কী বলছে? 'আমাদের ভিডিও দেখান।' মেয়েটা কি এখন ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে প্রমাণ দেখাবে যে, 'দেখুন, ও আমার বুকে হাত দিয়েছে'?"

বৃন্দা আরও বলেন, "নির্লজ্জ পুলিশ! আমরা এই দেশে আইন কেন বানিয়েছিলাম? আমাদের লড়াইটা কিসের জন্য ছিল? ওরা এই মেয়েটিকে বলছে, 'আমাদের ভিডিও দেখান! এসিপি কি আপনার বুকে হাত দিয়েছে? ভিডিও দেখান!' এই বদমাশগুলোর লজ্জা হওয়া উচিত! আর অমিত শাহ, আপনারও লজ্জিত হওয়া উচিত! একটা মেয়েকে হেনস্থা করার জন্য আপনারা নতুন নতুন নিয়ম বানাচ্ছেন! এটা গোটা সাংবাদিক সমাজের জন্য একটা অপমান!"

তিনি বলেন, "এটা সব মহিলাদের জন্য অপমান। আর আদালত কী করছে? আদালত কি নিজে দেখতে পাচ্ছে না কী হচ্ছে? আমরা এখানে বসে আছি আর ওরা টালবাহানা করছে। আমরা একজন সিনিয়র অফিসারের সঙ্গে দেখা করানোর কথা বলছি, আর ওরা অজুহাত দিচ্ছে যে আজ কেউ নেই, সবাই ডিউটিতে বাইরে গেছে। অথচ এফআইআর দায়ের করার মতো নির্দিষ্ট কাজটা করার জন্য কেউ নেই। সেই কারণেই আজ নির্যাতিতা মিছিল করতে বাধ্য হচ্ছেন।"

এদিকে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, ৩ অক্টোবরের বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে তিন মহিলা সাংবাদিকের যৌন হেনস্থার অভিযোগ 'সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের' জন্য ক্রাইম ব্রাঞ্চে পাঠানো হয়েছে।

দিল্লি পুলিশের দাবি

এক্স (X) হ্যান্ডেলে একটি পোস্টে দিল্লি পুলিশ লিখেছে, "০৩-১০-২৬ তারিখে নয়াদিল্লি এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলানোর সময় পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে তিন মহিলা সাংবাদিক যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেছেন। নয়াদিল্লি জেলা তাঁদের অভিযোগ গ্রহণ করেছে এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য তা ক্রাইম ব্রাঞ্চে পাঠানো হয়েছে।"

০৩-১০-২৬ তারিখে নয়াদিল্লি এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলানোর সময় পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে তিন মহিলা সাংবাদিক যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেছেন। নয়াদিল্লি জেলা তাঁদের অভিযোগ গ্রহণ করেছে এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য তা ক্রাইম ব্রাঞ্চে পাঠানো হয়েছে।

যন্তর মন্তরে পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে তিন মহিলার যৌন হেনস্থার অভিযোগ নিয়ে এএনআই-কে ডিসিপি নেহা যাদব জানান, অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, মেডিক্যাল পরীক্ষাও হয়েছে এবং বিষয়টি ক্রাইম ব্রাঞ্চে পাঠানো হয়েছে।

নেহা যাদব বলেন, "এলাকায় বিএনএসএস-এর ১৬৩ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও, ৩ অক্টোবর এসআইআর-এর প্রতিবাদে আইসা (AISA) এবং অন্যান্য দল বিক্ষোভ দেখায়। বিএনএসএস-এর ১৬৩ ধারার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বিক্ষোভকারীদের জায়গা খালি করতে বলা হয়। তারা রাজি না হওয়ায় তাদের আটক করা হয়। সন্ধে ৬টা নাগাদ নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তিন মহিলা অভিযোগ করেন যে, আটক করার সময় দিল্লি পুলিশের অফিসার ও কর্মীরা তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। তাঁদের অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, মেডিক্যাল পরীক্ষা হয়েছে এবং বিষয়টি ক্রাইম ব্রাঞ্চে পাঠানো হয়েছে। কারও কাছে এই ঘটনার কোনও ফুটেজ থাকলে তা ক্রাইম ব্রাঞ্চকে দেওয়ার অনুরোধ করছি।"