স্বামী স্ত্রী দুজনেই কর্পোরেট সংস্থার উঁচু পদে কর্মরত। কলকাতার অভিজাত এলাকায় একটি ফ্ল্যাট আর গাড়িও রয়েছে। কিন্তু সেই নীল আলোয় ভরা  ড্রয়িং রুমেও পড়েছে গার্হস্থ হিংসার আঁচ। এমনিতে কাজের জন্য গৃহকর্তী দিনের অনেকটা সময়ই বাড়ির বাইরে কাটান। আর ঘরে ফিরে থাকে গৃহস্থালীর হাজারও কাজ সারার ঝক্কি পোহাতে হয়। আর স্বামী অফিস ট্যুরের কারণে মাসের অনেকটা সময়ই থাকেই শহরের বাইরে। তাই এতদিন সেই সমস্যা থেকে অনেকটাই দূরে ছিলেন দাম্পতি। লকডাউনের কারণে বদ্ধ ঘরে দিন কাটছে স্বামী স্ত্রীর। কথা-কুথায় বাড়ছে বিবাদ। চার দেওয়ালে আটকা পড়েও অনেকটাই দূরে সরে যাচ্ছেন তাঁরা। 

ঠিক এই ধরনের ছবি অন্য রঙে আঁকা হয়েছে শহরের বস্তিতে। যেখানে লকডাউনের কারণে কাজ হারানো স্বামীর আক্রোশ গিয়ে পড়েছে স্ত্রী আর সন্তানদের ওপর। দিন রাত চলছে মারধর। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই  লকডাউনের পথেই হাঁটা শুরু করেছিল ভারত। বর্তমানে আর্থিক ক্রিয়া কলাপ শুরু হলেও  এখনও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তাই অনেক মানুষই বর্তমানে রয়েছেন গৃহবন্দি। 


আর নানা প্রতিকূলতার কারণে লকডাউন বেড়েছে গার্হস্থ হিংসা। তেমনই বলছে কেন্দ্রীয় মহিলা কমিশনের রিপোর্ট। গত এপ্রিল মাসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে  লকডাউনের প্রথম দফা অর্থাৎ ২৩ মার্চ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মহিলা কমিশনে ৫৮৭টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। যারমধ্যে ২৩৯টি ছিল গার্হস্থ হিংসা সংক্রান্ত।  যা নিয়ে রীতিমত উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জাতীয় মহিলা কমিশনের চেয়ার পার্সেন রেখা শর্মা। তার আগে ২৭ ফেব্রুয়ারী থেকে ২২ পর্যন্ত কমিশনে নথিভুক্ত হয়েছিল মাত্র ২৩৯টি অভিযোগ। ২৫৬ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত জাতীয় মহিলা কমিশনে মোট ১৪৭৭ টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। যা তুলনা মূলকভাবে অনেকটাই বেশি। 


লকডাউনের সময় দেশে বেড়ে চলা নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে একটি শর্ট ফিল্মও তৈরি করেছেন অভিনেত্রী নন্দিতা দাস। দেশ জুড়ে চলা গার্হস্থ হিংসা রুখতে এগিয়ে এসেছে বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনগুলি ইতিমধ্যেই শুরু করেছে প্রচার। তার প্রথম সারিতেই রয়েছে বিদ্যা বালান, অনুষ্কা শর্মা, মাধুরী দীক্ষিতের মত জনপ্রিয় অভিনেত্রীরা। চালু হয়েছে বেশ কয়েকটি হেল্পলাইন নম্বরও। কিন্তু তা দিয়ে পরিস্থিতিত কতটা স্বাভাবিক  হবে না নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। 


তবে এই ছবি শুধু এই দেশে নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ডের মত প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতেই বেড়েছে গার্হস্থ হিংসা। রাষ্ট্র সংঘের তরফ থেকে জানান হয়েছে  মরামারির এই আবহেই লেবানন ও মালেশিয়ায় হেল্প লাইন কলের সংস্থা দ্বিগুণ হয়েছে। আর চিনে হয়েছে তিনগুণ। গৃহস্থ হিংসা নিয়ে গুগুলের সার্চ ইঞ্জিনে সবথেকে বেশি তথ্য খোঁজা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মত শান্তিপ্রিয় দেশেও।  যা নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করা হয়েছে রাষ্ট্র সংঘের তরফ থেকে। 

তবে এই সব দেশগুলির থেকে ভারতের আর্থ সামাজিক চালচিত্র একদমই আলাদা। একটি তথ্য বলছে  ভারতীয় মহিলারা গৃহস্থালীর কাজে দিনের ৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় করেছেন। যা পুরুষদের তুলনায় ৫৭৭ শতাংশ বেশি। পুরুষরা ব্যয় করেন মাত্র ৫২ মিনিট। কর্মজীবী মহিলাদের ক্ষেত্রে তা অনেকটা ডবল শিফটের মত হয়ে যায়। বাইরে অফিস সামলে এসে বাড়িতে ঘরের নানান কাজ সামলাতে হয় তাঁদের। লকডাউনের কারণে অনেক মহিলাই ঘরে বসে কাজ করছেন।  অফিসের কাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে  তাঁদের গৃহস্থালীর কাজও সামলাতে হচ্ছে। 


কিন্তু গৃহস্থ হিংসা মানে শুধু মারধরই নয়। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনও রয়েছে। সেই মানসিক নির্যাতনও ভয়ঙ্কর আকার নিচ্ছে বলেও মনে করেছেন অনেক মনোবিদ।  সব মিলিয়ে লকডাউনের এই সময়ে মহিলারা কিছুটা হলেও কোনঠাসা বাড়িতে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানিও একই মত প্রকাশ করেছেন। তবে এখনও দেশের সংস্কৃতি বজায় রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেছেন, এমনটাই নয় যে দেশের প্রতিটি বাড়িতেই গার্হস্থ হিংসা দেখা দিয়েছে। প্রতি ঘরে স্বামীরা তাঁদের স্ত্রীর গায়ে হাত তুলছেন।  তবে লকডাউনের কারণে মহিলারা অভিযোগ দায়ের করতে পারছেন না এমনটাও মানতে নাজার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তিনি বলছেন প্রতিটি রাজ্যের পুলিশ এই বিষয়টি নিয়ে রীতিমত যত্নবান। তিনি আরও বলেন শুধু মহিলা নয় আক্রান্ত শিশুদের উদ্ধার করে পুনর্বাসনের কাজ চালান হচ্ছে।