নির্বাচন কমিশন এবং বিচারব্যবস্থার মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এর প্রতিবাদে এবার খোলা চিঠি দিলেন দেশের প্রাক্তন বিচারপতি এবং আমলারা। তাঁদের দাবি, প্রমাণ ছাড়াই এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI), উচ্চ আদালত এবং অন্যান্য বিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপপ্রচার চলছে। এর বিরুদ্ধে এবার সরব হলেন একদল প্রাক্তন বিচারপতি এবং অবসরপ্রাপ্ত সাংবিধানিক আধিকারিক। রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষকে দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষার আবেদন জানিয়ে তাঁরা একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন।
প্রাক্তন বিচারপতি ও অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিকদের খোলা চিঠি
৭ অক্টোবর লেখা ওই চিঠিতে তাঁরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, "প্রাক্তন বিচারপতি এবং সাংবিধানিক পদের অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক হিসেবে" তাঁরা এই চিঠি লিখছেন। কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে তাঁরা কথা বলছেন না। চিঠিতে তাঁরা বলেছেন, যে কোনও প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করাটা গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু আদালতে কোনও প্রমাণ ছাড়াই সাংবিধানিক কর্তাদের 'চোর', 'পুতুল' বা 'বিক্রি হয়ে যাওয়া' বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রবণতা নিয়ে তাঁরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
'ভোট চুরি'র অভিযোগের সমালোচনা চিঠিতে
'ভোট চুরি'-র মতো অভিযোগগুলোরও কড়া সমালোচনা করা হয়েছে ওই চিঠিতে। প্রাক্তন বিচারপতিরা বলেছেন, এই ধরনের অভিযোগ আদালতের বদলে সাংবাদিক বৈঠকে বেশি করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন যখন হলফনামা চায়, তখন কেউ তা জমা দেয় না। নির্বাচনে হারলেই ইভিএম (EVM)-এর দিকে আঙুল তোলার যে রেওয়াজ তৈরি হয়েছে, তা নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রাক্তন বিচারপতি এবং আমলাদের অভিযোগ, কিছু সমাজকর্মী বা গোষ্ঠী উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই আদালতে মামলা দায়ের করছে। আর রায় নিজেদের পক্ষে না গেলেই বিচারব্যবস্থার সমালোচনা করা হচ্ছে। তাঁদের মতে, এই ধরনের আক্রমণ বিচারব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) নিয়েও চিঠিতে কথা বলা হয়েছে। স্বাক্ষরকারীরা জানিয়েছেন, এটি নির্বাচন পরিচালনার একটি সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়া। ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২১(৩) ধারার কথা উল্লেখ করে তাঁরা বলেছেন, ভোটার তালিকা সংশোধন করার পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। অতীতেও এমন সংশোধন করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তি, ভুয়ো নাম এবং ঠিকানা বদল করা ভোটারদের নাম বাদ দিতেই এই প্রক্রিয়া চালানো হয়। পাশাপাশি যোগ্য নাগরিকদের নাম যাতে তালিকায় থাকে, সেটাও নিশ্চিত করা হয়। গত দুই দশকে প্রচুর মানুষ কাজের খোঁজে বা অন্য কারণে শহরমুখী হয়েছেন। তাই ভোটার তালিকা সংশোধন করাটা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
SIR নিয়ে সওয়াল
সুপ্রিম কোর্টও এই স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর-কে বৈধ বলে জানিয়েছে। চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, নোটিশ দেওয়া, শুনানি, আপত্তি জানানো এবং আপিল করার মতো সব রকম সুরক্ষাকবচ মেনেই কমিশন এই কাজ করে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর এই ক্রমাগত হামলার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন প্রাক্তন আমলারা। তাঁরা বলেছেন, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই হলো মানুষের আস্থা। নাগরিকদের যদি বারবার বলা হয় যে তাঁদের ভোটের কোনও দাম নেই, তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর থেকে তাঁদের বিশ্বাস উঠে যাবে। এর ফলে সমাজে অশান্তি ছড়াতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তাঁদের আবেদন, নির্বাচনকে কালিমালিপ্ত না করে ভোটে লড়ুন। কোনও অভিযোগ থাকলে প্রমাণ-সহ তা নির্বাচন কমিশন এবং আদালতে জানান। সংবাদমাধ্যমের কাছেও তাঁদের অনুরোধ, খবর প্রকাশের আগে অভিযোগগুলো ভালো করে যাচাই করে নিন। পাশাপাশি, সাংবিধানিক সংস্থাগুলোকেও স্বচ্ছতা বজায় রেখে মানুষের বৈধ অভিযোগগুলোর সমাধান করার কথা বলেছেন তাঁরা।
চিঠির শেষে বলা হয়েছে, "সাংবিধানিক সংস্থাগুলো কোনও সরকারের নয়, এগুলো ভারতের জনগণের।" তাই নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার্থে সাধারণ মানুষকে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।


