যোধপুরে শুরু হয়েছে বায়ুসেনার মেগা মহড়া 'তরঙ্গ শক্তি ২০২৬'। ভারতের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে জার্মানির এয়ারবাস এ৪০০এম এবং আমেরিকার এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমান। মোট সাতটি বন্ধু রাষ্ট্র এই মহড়ায় অংশ নিচ্ছে।
রাজস্থানের যোধপুর এয়ারফোর্স স্টেশনের আকাশ এখন রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতার এক দারুণ নজির গড়ে জার্মান বায়ুসেনা 'তরঙ্গ শক্তি ২০২৬' মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। তাদের অত্যাধুনিক সামরিক বিমান এয়ারবাস এ৪০০এম (Airbus A400M) এই মহড়ায় বিশেষ নজর কাড়ছে।
তরঙ্গ শক্তি নিয়ে জার্মান ক্যাপ্টেনের অভিজ্ঞতা
সংবাদসংস্থা এএনআই-কে জার্মান বায়ুসেনার ক্যাপ্টেন মরিস বার্নস বলেন, "আমি এ৪০০এম বিমানের ফার্স্ট অফিসার। এবারের তরঙ্গ শক্তিতে অংশ নিতে পেরে দারুণ লাগছে। ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফটের ক্রু হিসেবে আমরা অনেক নতুন কিছু শিখছি। বিশেষ করে ভারতীয় বায়ুসেনার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ।"
ক্যাপ্টেন বার্নস আরও জানান, "আগেরবারের চেয়ে এবারের মহড়া বেশ বড় পরিসরে হচ্ছে। জার্মানি এবার এ৪০০এম নিয়ে এসেছে। আমরা বড়সড় ফোর্স এনগেজমেন্টে অংশ নিচ্ছি। অর্থাৎ, ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফট হয়েও আমরা ফাইটার জেটগুলোর বড় মহড়ায় সরাসরি যুক্ত থাকছি।"
এই বিমানের ক্ষমতা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, "এ৪০০এম হলো জার্মান বায়ুসেনার মেরুদণ্ড। এটি একটি ভারী কার্গো বিমান। কৌশলগত মিশন থেকে শুরু করে লজিস্টিকস—সব কাজেই এটি দারুণ দক্ষ।"
মহড়া থেকে কী শিখছেন, সেই প্রসঙ্গে ক্যাপ্টেন বার্নস বলেন, "জার্মান বায়ুসেনার জন্য ভারতে ওড়া একটা বড় শিক্ষণীয় বিষয়। ভারতীয় বায়ুসেনার প্ল্যানিং সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানছি। এত বড় মহড়ায় কীভাবে কাজ করতে হয়, তারও ভালো ধারণা পাচ্ছি। এর ফলে ভারত ও জার্মানির ফাইটার জেট এবং ট্রান্সপোর্ট বিমানগুলোর মধ্যে বোঝাপড়া আরও মজবুত হচ্ছে।"
মহড়ায় আমেরিকার এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান
যোধপুরের আকাশে রবিবার আমেরিকার এফ-৩৫এ লাইটনিং টু (F-35A Lightning II) যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা যায়। এই অত্যাধুনিক স্টিলথ ফাইটার জেটগুলো 'তরঙ্গ শক্তি ২০২৬'-এর জয়েন্ট ট্রেনিংয়ে অংশ নিয়েছে। এর ফলে ভারতীয় বায়ুসেনার পাশাপাশি বিদেশি শক্তিগুলোর উপস্থিতিও বেশ জোরালো হয়েছে।
জাপানের মিসাওয়া এয়ার বেসের ১৩তম ফাইটার স্কোয়াড্রনের এই এফ-৩৫এ বিমানগুলো মহড়ার অপারেশনাল ফেজে যোগ দিয়েছে। 'পাওয়ার ইন পার্টনারশিপ' থিমের ওপর ভিত্তি করে সাতটি বন্ধু দেশের বায়ুসেনা এই মহড়ায় একজোট হয়েছে।
'পাওয়ার ইন পার্টনারশিপ' মহড়া
গত সপ্তাহে যোধপুর এয়ারফোর্স স্টেশনে এফ-৩৫এ লাইটনিং টু বিমানগুলোকে উড়ান ভরতে দেখা যায়। ভারতীয় বায়ুসেনা এবং অন্যান্য বন্ধু দেশের বিমান ও কর্মীদের সঙ্গেই এরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর যোধপুরে 'তরঙ্গ শক্তি ২০২৬'-এর অপারেশনাল ফেজ শুরু করেছে ভারতীয় বায়ুসেনা। অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ফ্রান্স, জার্মানি, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশ—এই সাতটি দেশ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। বিদেশি বিমানগুলোর মধ্যে রয়েছে এফ-৩৫ লাইটনিং টু, রাফাল, এফ-১৬, এ৪০০এম, এমআরটিটি, সি-১৩০, সি-১৩০জে এবং কেসি-৩০এ।
পারস্পরিক বোঝাপড়া ও পেশাদারি আদানপ্রদান
শুধু আকাশে ওড়াই নয়, এই মহড়া অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর এয়ারক্রু, মিশন প্ল্যানার এবং সাপোর্ট স্টাফদের মধ্যে পেশাদারি আদানপ্রদানেরও সুযোগ করে দিচ্ছে। পারস্পরিক বোঝাপড়া, একে অপরের থেকে শেখা এবং এরোস্পেস সেফটির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রক আরও জানিয়েছে, এই মহড়ার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের বাহিনী একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। ২০২৪ সালের প্রথম সংস্করণের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই ২০২৬ সালের এই মহড়া সাজানো হয়েছে। বেশ কয়েকটি দেশ আবার পর্যবেক্ষক হিসেবেও যোগ দিয়েছে।
আকাশে মহড়ার পাশাপাশি সেমিনার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর, সেখোঁ ম্যারাথন, হেরিটেজ ট্যুর এবং যোগা সেশনের মতো নানা কর্মসূচিও রাখা হয়েছে। আমেরিকার বায়ুসেনা সম্প্রতি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে ১৩তম এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স ইউনিটের কর্মীদের যোধপুরে এফ-৩৫এ বিমানের রুটিন রক্ষণাবেক্ষণ করতে দেখা যাচ্ছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষমতার প্রদর্শন
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মতে, 'তরঙ্গ শক্তি ২০২৬' ভারতীয় বায়ুসেনাকে তাদের অপারেশনাল ক্ষমতা এবং পেশাদারিত্ব তুলে ধরার দারুণ সুযোগ করে দিয়েছে। একইসঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে ভারতের নিজস্ব এরোস্পেস ও প্রতিরক্ষা ক্ষমতা কতটা এগিয়েছে, সেটাও এই মহড়ায় স্পষ্ট হচ্ছে।


