গোয়া বলতেই চোখে ভাসে বিকিনি, হাওয়াই শার্ট, ফ্লোরাল ড্রেস। কিন্তু এগুলো টুরিস্টদের পোশাক। আসল গোয়ার ঘরে ঘরে ৪০০ বছরের পর্তুগিজ ইতিহাস লুকিয়ে আছে ‘পানো ভাজ’ আর ‘কাস্টি’তে। বিয়েতে গোয়ান ক্যাথলিক মেয়েরা এখনও সাদা গাউন ‘পানো ভাজ’ পরেন, আর হিন্দু কুনবি আদিবাসী মহিলাদের লাল-কালো চেক ‘কাস্টি’ শাড়ি UNESCO-র লিস্টে জায়গা পেয়েছে।

বাগা বিচে বিকিনি, ক্লাবে শর্ট ড্রেস – ইনস্টাগ্রামে গোয়ার এই ছবিই ভাইরাল। কিন্তু পাঞ্জিমের ফন্টেইনহাসে ঢুকলেই দেখবেন, ৮০ বছরের ঠাকুমা পরছেন হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ফ্রক, মাথায় লেসের ওড়না। ওটাই ‘পানো ভাজ’।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

আবার ক্যানাকোনার গ্রামে গেলে দেখবেন, মাঠে কাজ করছেন আদিবাসী মহিলা, পরনে হাঁটু পর্যন্ত লাল-কালো চেক শাড়ি, গায়ে কোনও ব্লাউজ নেই। ওটাই ‘কাস্টি’ বা কুনবি শাড়ি।

গোয়ার পোশাক মানে শুধু বিচওয়্যার নয়। ৪৫১ বছর পর্তুগিজ শাসনের ছাপ, কোঙ্কনি সংস্কৃতি আর আদিবাসী রীতি মিলে তৈরি হয়েছে গোয়ার নিজস্ব ফ্যাশন।

*গোয়ার ৩টে প্রধান ঐতিহ্যবাহী পোশাক:*

*১. পানো ভাজ – গোয়ান ক্যাথলিকদের গর্ব*

*কী জিনিস:* ‘পানো’ মানে কাপড়, ‘ভাজ’ মানে পোশাক। এটা আসলে পর্তুগিজ গাউন। হাঁটু বা গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা, ফুল স্লিভ, গলার কাছে লেস, সামনে বোতাম। সাথে মাথায় ‘ওড়নি’ নামের লেসের স্কার্ফ।

*কোথায় পরে:* চার্চের প্রার্থনা, বিয়ে, বাপ্তিস্ম, ক্রিসমাস, ইস্টার। গোয়ান ক্যাথলিক মেয়ের বিয়েতে লাল বেনারসি নয়, সাদা পানো ভাজ মাস্ট। ১৮০০ সাল থেকে এই রীতি।

*বিশেষত্ব:* গরমে আরামদায়ক সুতি বা লিনেন কাপড়। লেসের কাজ, মুক্তোর বোতাম – পর্তুগিজ স্টাইল। এখন আধুনিক মেয়েরা ছোট পানো ভাজ পার্টিতেও পরে।

*পুরুষদের:* ক্যাথলিক পুরুষরা পরে ‘কোট-সুট’ বা ‘লেঙ্গি-কোট’। সাদা শার্ট, কালো কোট, মাথায় টুপি। বিয়েতে এটাই ড্রেস কোড।

*২. কাস্টি বা কুনবি শাড়ি – গোয়ার আদি পোশাক*

*কী জিনিস:* গোয়ার আদিবাসী কুনবি ও গাওডা সম্প্রদায়ের মহিলাদের পোশাক। ৫ গজের ছোট শাড়ি। লাল-কালো, লাল-সাদা চেক বা স্ট্রাইপ। হাঁটুর উপর পর্যন্ত কাছা দিয়ে পরা হয়। ব্লাউজ নেই, শাড়ির আঁচল দিয়ে বুক ঢাকা।

*ইতিহাস:* ১২ শতকের পোশাক। ধান রোয়া, মাছ ধরার জন্য ছোট শাড়ি সুবিধার। পর্তুগিজরা আসার পরেও কুনবিরা এই পোশাক ছাড়েনি। ২০২১-এ UNESCO ‘Intangible Cultural Heritage’-এর লিস্টে কুনবি বুননকে রেখেছে।

*কোথায় দেখবেন:* ফেনি উৎসব, শিগমো নাচ, ত্রিভুবনী মেলায়। এখন দাম ৮০০-২,০০০ টাকা। পাঞ্জিমের গোয়া হ্যান্ডিক্রাফট এম্পোরিয়ামে পাবেন।

*পুরুষদের:* কুনবি পুরুষরা পরে ‘কাষ্টি’ – খাটো ধুতি, গায়ে ‘কাওঞ্চো’ নামের হাতকাটা জামা। মাথায় লাল গামছা।

*৩. নব-বৈরী – গোয়ান হিন্দু মহিলাদের বিয়ের শাড়ি*

*কী জিনিস:* ৯ গজের সিল্ক শাড়ি। মেরুন, সবুজ, রানী কালার। জরি পাড়। কোমরে কাছা দিয়ে মহারাষ্ট্রীয় স্টাইলে পরা হয়, কিন্তু আঁচল সামনে থাকে। সাথে নাকে বড় নথ, চুলে গজরা।

*কোথায় পরে:* গোয়ান হিন্দু বিয়ে, মঙ্গলাগৌর, হরতালিকা তিজ। পর্তুগিজ আমলেও হিন্দু মহিলারা এই পোশাক ধরে রেখেছিলেন।

*বিশেষত্ব:* শাড়ির সাথে ‘ঘাগরা’ স্টাইল। নাচের সময় সুবিধা। গণেশ চতুর্থীতে গোয়ার ঘরে ঘরে মহিলারা নব-বৈরী পরে ফুগডি নাচ করেন।

*কার্নিভালের পোশাক – রঙের উৎসব:*

ফেব্রুয়ারিতে গোয়া কার্নিভাল হয়। তখন লোকালরা পরে ‘কিং মোমো’ কস্টিউম – লাল কোট, টুপি, মুখোশ। মেয়েরা পরে রঙিন গাউন, মাথায় ফুলের মুকুট। ৪০০ বছরের পর্তুগিজ ‘Mardi Gras’-এর রীতি। রাস্তায় রঙ, নাচ, গান।

*এখন গোয়ানরা কী পরে?*

গ্রামে: বয়স্ক মহিলারা এখনও পানো ভাজ বা ম্যাক্সি পরেন। পুরুষরা লুঙ্গি-শার্ট।

শহরে: জিন্স, টি-শার্ট, কুর্তি। তবে চার্চে গেলে মেয়েদের মাথা ঢাকা, হাঁটু ঢাকা ড্রেস মাস্ট। ছোট পোশাকে ঢুকতে দেয় না।

*টুরিস্ট হিসেবে কী পরবেন, কী পরবেন না?*

*পরুন:*

*১. চার্চ/মন্দির:* হাঁটু ঢাকা স্কার্ট বা প্যান্ট, কাঁধ ঢাকা টপ। স্কার্ফ ক্যারি করুন।

*২. বিচ:* বিকিনি শুধু বিচের মধ্যেই। বিচ থেকে হোটেলে যেতে গায়ে শার্ট বা সারং জড়ান। লোকালরা পছন্দ করে না।

*৩. মার্কেট/গ্রাম:* কুর্তি-পালাজ্জো, ম্যাক্সি ড্রেস। সম্মান পাবেন, দামও কম বলবে।

*৪. কার্নিভাল/ফেনি ফেস্ট:* রঙিন ড্রেস, ফুলের হেয়ার ব্যান্ড। লোকালদের সাথে মিশে যাবেন।

*পরবেন না:*

*১. মন্দিরে শর্টস, স্লিভলেস।* মঙ্গেশি, শান্তাদুর্গা মন্দিরে ড্রেস কোড আছে।

*২. গ্রামের ভিতর বিকিনি।* কুনবি গ্রামে গেলে কাঁধ-হাঁটু ঢাকা পোশাক।

*৩. কাস্টি শাড়ি ভুলভাবে।* সম্মানের পোশাক। ফ্যাশন শো করতে গিয়ে অপমান করবেন না।

*কোথায় কিনবেন আসল গোয়ান পোশাক?*

*১. কুনবি শাড়ি:* পাঞ্জিম – গোয়া হ্যান্ডিক্রাফট, মারগাও – কুনবি বুনন সেন্টার। ১,২০০ টাকা থেকে শুরু।

*২. পানো ভাজ লেস:* মাপুসা মার্কেট। পুরনো পর্তুগিজ দোকানে হাতে বোনা লেস পাবেন।

*৩. ফেনি ফেস্ট টি-শার্ট:* লোকাল মার্কেটে ২০০ টাকায় ‘Susegad’ লেখা টি-শার্ট।

*শেষ কথা:*

গোয়া মানে শুধু পার্টি ডেস্টিনেশন নয়। ৪০০ বছরের কালচার, পর্তুগিজ-ভারতীয় মিক্সড হেরিটেজ। পানো ভাজের লেসে, কুনবি শাড়ির চেকে সেই গল্প লেখা আছে।

পরের বার গোয়া গেলে বিচের ভিড় ছেড়ে ফন্টেইনহাসের গলিতে হাঁটুন। ৮০ বছরের ঠাকুমাকে দেখবেন পানো ভাজ পরে চার্চ যাচ্ছেন। কুনবি গ্রামে গিয়ে লাল শাড়ি পরা মহিলার সাথে ফুগডি নাচুন।

তখন বুঝবেন, আসল গোয়ার রং বিকিনিতে নয়, কাস্টি আর পানো ভাজে।