হিমাচল প্রদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে মানুষের দৈনন্দিন জীবন বদলে যাচ্ছে। চাষবাসের ধরন বদলানো থেকে শুরু করে জলের উৎস বাঁচানো— গ্রামের মানুষ এখন নিজেরাই পরিস্থিতি সামলাতে নানা বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
হিমাচল প্রদেশে ইদানীং ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই আছে। তবে বিপদ আসার আগেই এখানকার বেশ কয়েকটি গ্রাম এখন সতর্ক। মান্ডি, কুল্লু, শিমলা এবং সিরমৌর জেলার বিভিন্ন পঞ্চায়েত এলাকার মানুষজন চাষের ধরনে বদল আনছেন। পাশাপাশি তাঁরা স্থানীয় জলের উৎসগুলো সংস্কার করছেন এবং দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য নিজস্ব পরিকাঠামো তৈরি করছেন।
গ্রামের মানুষ এখন বুঝে গেছেন যে, জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা আর ভবিষ্যতের ব্যাপার নেই। বরং এটা এখন তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে বড় বদলটা চোখে পড়ছে কৃষি ও উদ্যানপালনে। এই রাজ্যের বেশিরভাগ মানুষের রুটিরুজি এর ওপরই নির্ভরশীল। আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা আর নতুন নতুন সমস্যার সঙ্গে পাল্লা দিতে কৃষকরা এখন ফসলের ধরনেও বদল আনছেন।
যেমন ধরুন কুল্লু জেলার বাজৌরা। এখানকার বাগানে ভাইরাসের আক্রমণ হওয়ায় চাষিরা প্রথমে আপেল এবং পরে ডালিম চাষ থেকে সরে আসেন। এখন তাঁরা বিকল্প হিসেবে পার্সিমন ফলের চাষ করছেন। অন্যদিকে, শিমলা জেলার সান্ধুতে ২০টিরও বেশি পরিবার প্রাকৃতিক চাষের দিকে ঝুঁকেছেন। তাঁরা দেখেছেন, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার মধ্যে এই পদ্ধতিতে চাষ করাটা লাভজনক এবং নিরাপদ।
আবার সিরমৌর জেলার পারারা গ্রামে বদলের ছবিটা একটু অন্যরকম। এখানকার পরিবারগুলো রসুন চাষের পাশাপাশি বিশেষ জাতের আপেল চাষ করছেন। অর্থাৎ, পুরোপুরি উদ্যানপালন ছেড়ে না দিয়ে, তাঁরা বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে রোজগার ঠিক রাখার চেষ্টা করছেন।
জল সংরক্ষণ ও দুর্যোগ মোকাবিলায় গ্রামের মানুষ
শুধু চাষবাস নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও কাজ চলছে। সিরমৌরের থানা কাশোগা গ্রামে মহিলাদের কয়েকটি দল ঐতিহ্যবাহী 'বাওড়ি' বা পাহাড়ি জলের কুণ্ডগুলো সংস্কারের কাজ করছেন। 'পিপলস সায়েন্স ইনস্টিটিউট' এবং 'সেন্টার ফর বিজনেস অ্যান্ড এন্টারপ্রেনিউরিয়াল ডেভেলপমেন্ট'-এর প্রশিক্ষণের সাহায্যে গ্রামবাসীরা ইতিমধ্যেই পাঁচটি জলের উৎস পুনরুদ্ধার করেছেন। আরও কয়েকটির কাজ চলছে।
এই উদ্যোগটা খুবই জরুরি ছিল। কারণ, একসময় এই গ্রামে ৩৫টি এমন জলের কুণ্ড ছিল, যার মধ্যে এখন মাত্র ১০টি টিকে আছে। পাহাড়ি এলাকায় যেখানে জলের অভাব বাড়ছে, সেখানে গ্রামবাসীদের এই উদ্যোগ সত্যিই পথ দেখাচ্ছে। গ্রামস্তরে দুর্যোগ মোকাবিলার দিকেও এখন বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে।
২০২৩ সালের বন্যা ও ধসের পর, শিমলার কাছে শোগি গ্রামের বাসিন্দারা 'আদ্রা ইন্ডিয়া' (ADRA India)-র সাহায্যে একটি গ্রাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি তৈরি করেছেন। গ্রামের মানুষজন আপৎকালীন সময়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া এবং প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এর ফলে ভবিষ্যতের যেকোনো বিপদে তাঁরা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবেন। হিমাচল প্রদেশে এমন কমিটি এখনও খুব একটা দেখা যায় না। তবে দুর্যোগের পর শুধু বাইরের সাহায্যের দিকে তাকিয়ে না থেকে, পঞ্চায়েত স্তরে এই ধরনের প্রস্তুতি একটা বড় ইতিবাচক বদল।
'কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার' (CEEW) এবং 'ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট' (ICIMOD)-এর একটি যৌথ সমীক্ষায় এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে। গবেষকরা ১২টি গ্রাম পঞ্চায়েতে ঘুরে দেখেছেন যে, স্থানীয় উদ্যোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্যের মেলবন্ধনেই এই সাফল্য আসছে।
সমীক্ষকদের মতে, কৃষক, মহিলাদের দল এবং গ্রাম কমিটির মতো স্থানীয় মানুষজন যখন সরকারি প্রকল্প, এনজিও এবং কৃষি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করেন, তখনই সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। এই ধরনের যৌথ উদ্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় দারুণ কার্যকর হতে পারে।






