মানালি থেকে লাহুল-স্পিতি তখন আরও দুর্গম। রাস্তা বলে কিছুই নেই। রোটাং পাসের মধ্যে দিয়ে একটা রাস্তা গিয়েছে বটে কিন্তু তার অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। অথচ, কৌশলগতভাবে চিনের সঙ্গে সামরিক শক্তির অবস্থানে লাহুল-স্পিতি ভারতের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। লাহুল-স্পিতির গা-ঘেঁষেই রয়েছে তিব্বত। এই স্থানে চিনা সেনাদের অনুপ্রবেশ এবং দখলদারির লড়াই শুরু হতেই বহু তিব্বতি লাহুল-স্পিতি দিয়ে ভারতে ঢুকে পড়ে। এণনকী দালাই-লামাকেও এই রাস্তা দিয়ে ভারতে আনা হয়েছিল। কিন্তু, রাস্তার দুর্গমতা চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছিয়ল ভারত সরকারের। সেই সময় প্রথম ভারত সরকারের কাছে লাহুল-স্পিতি-র গুরুত্বটা বোধগম্য হয়। লাহুল-স্পিতি-র পাশেই লাদাখ-লেহ-র সীমানা। দুর্গম এই পাহাড়ি এলাকায় তখনও চিনাদের অনুপ্রবেশ সেভাবে ঘটেনি। আকসাই চিন নিয়ে একটা বিবাদ চলছিল বটে, কিন্তু লাদাখ-লেহ-র দুরগম্যতা দূর করার মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ভারত সরকারের ভাবনাতেই ছিল না। লাহুল-স্পিতির মানুষ জওহরলাল নেহরুর কাছে দাবি তুলেছিলেন যদি একটা সুড়ঙ্গ বানানো যায়। তাহলে লাহুল-স্পিতির সঙ্গে সারাবছর যোগাযোগ রক্ষা হবে। নেহরুরর আমলে অবশ্য আর অগ্রগতি হয়নি।  

আরও পড়ুন- ১০ হাজার ফিট উপরে বিশ্বের দীর্ঘতম টানেল, আজ মোদীর হাত ধরে ইতিহাস লিখতে চলেছে অটল টানেল

রোটাং পাস দিয়ে পীরপাঞ্জল উপত্যকার বুকের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ খোড়ার বিষয়টি প্রথম প্রস্তাব আকারে গৃহীত হয় ১৯৮৩ সালে। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর তখতে ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু, ওই পর্যন্ত। এবারও কাজ ঝুলে যায়। অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী হলে ফের এই সুড়ঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বাজপেয়ী-র বহু পুরনো এক বন্ধু ছিলেন যার বাড়ি লাহুল-স্পিতিতে। তিনি বাজপেয়ীর সামনে এই সুড়ঙ্গ-এর বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। ২০০০ সালে হিমাচল প্রদেশে গিয়ে রোটাং-এর নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ খোড়ার বিষয়টি ঘোষণা করেন অটলবিহারী। এরপরই রাইটস থেকে সুড়ঙ্গের ফিজিবিলিটি স্টাডি শুরু করা হয়। প্রাথমিক প্রকল্প রিপোর্টে এই সুড়ঙ্গ তৈরির খরচ ৫ বিলিয়ন মানে ৫০০কোটি টাকা দেখানো হয়েছিল। এবং রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল কাজ শুরু হওয়ার ৭ বছরের মধ্যে সুড়ঙ্গ তৈরি হয়ে যাবে।  

ভিডিও স্টোরি- ৫০০ মিটার অন্তর সিসিটিভি, ১০ হাজার ফুটের উপর বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা টানেল এখন 'অটল' 

২০০২ সালের ৬ মে এই সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ সঁপে দেওয়া হয় বর্ডার রোড অর্গানাইজেশনের হাতে। যারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটা শাখা হিসাবে দুর্গম সব স্থানে এবং সীমান্ত এলাকায় রাস্তা-ব্রিজ ও সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ করে থাকে। বর্ডার রোড অর্গানাইজেশন তাদের দেওয়া রিপোর্টে সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়া এবং তা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দিতে ২০১৫ সালের কথা উল্লেখ করে।  

আরও পড়ুন- বন্ধুর 'বায়না' মেটাতেই রোটাং টানেলের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন অটলবিহারী, তাই মিলিয়ে দিল কংগ্রেস-বিজেপিকে

আবার সেই বিলম্ব। ফলে ২০০৩ সাল থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজে কোনও অগ্রগতি হয়নি। ইতিমধ্যে প্রকল্পের খরচা ৫ বিলিয়ন থেকে ১৭ বিলিয়নে পৌঁছে যায়। ২০০৭ সালের মে মাসে স্নোয়ি মাউন্টেনস ইঞ্জিনিয়ারিং  কর্পোরেশন ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড যা একটি অস্ট্রেলিয়ান সংস্থা, তাদেরকে রোটাং পাসে সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ দেওয়া হয়। এই সংস্থা জানায় ২০১৪ সালের মধ্যে সুড়ঙ্গ তৈরি হয়ে যাবে। কিন্তু একাধিক আলোচনা এবং ঘোষণার পরও ২০০৮ সাল পর্যন্ত কাজে কোনও অগ্রগতি হয়নি। ২০০৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই প্রকল্প পুরোপুরি মৃত অবস্থায় পড়েছিল। অবশ্য, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরেই সুড়ঙ্গ তৈরির দায়িত্ব একটা যৌথ উদ্যোগের হাতে ছাড়া হয়। এরা ছিল অ্যাফকনস ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, যা ভারতীয় নির্মাণ সংস্থা শাপুরজি-পালুনজি-র একটি শাখা এবং অস্ট্রিয়ার নির্মাণকারী সংস্থা স্ট্রাবার্গ এজি। ক্যাবিনেট কমিটিও রোটাং টানেল প্রকল্পকে গ্রিন সিগন্যাল দিয়ে দেয়।  

২০১০ সালের ২৮ জুন মানালি থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে রোটাং-এর সাউথ পোর্টালে প্রথম সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শুরু হয়। এরপর সুড়ঙ্গ খুঁড়তে গিয়ে বহুবার নানা ধরনের প্রাকৃতিক বাধার সম্মুখিন হতে হয় নির্মাণকারী সংস্থাকে। সুড়ঙ্গ খুঁড়তে গিয়ে কখনও ধসের মোকাবিলা করতে হয়েছে, আবার কখনও পাথরের গা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে জলের স্রোত। যার জন্য সুড়ঙ্গ খোঁড়া অনেক সময় ব্যহত হয়। এই সুড়ঙ্গ খুঁড়তে ড্রিল করা সম্ভব ছিল না। তাই ডিনামাইট ব্লাস্ট করে করে কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছিল।  

ভিডিও স্টোরি- অটল টানেল, চিনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ভারতের এক বড় হাতিয়ার

২৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই প্রকল্পের নামকরণ অটলবিহারী বাজপেয়ীর নাম করেন। ২০২০ সালে-র মে মাসেই টানেল খুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, অতিমারি এবং লকডাউনে জন্য তা আর সম্ভব হয়নি। নতুন করে ঠিক হয় যে ৩ অক্টোবর দেশের উদ্দেশে অটল টানেল-কে উৎসর্গস করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।