লকডাউনের ফলে স্পষ্টতই করোনাভাইরাস সংক্রমণের গতি কমানো গিয়েছে। যে লেখচিত্র চড়চড় করে বাড়ছিল, তা এখন অনেকটাই নেতিয়ে পড়েছে। এমনটা লকডাউন প্রত্যাহারের কয়েক সপ্তাহ পর পর্যন্ত দেখা যেতে পারে বলে জানাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। তারপরই আসবে বর্ষাকাল। জুলাইয়ের শেষের দিকে বা অগাস্ট মাসে ভারতে কোভিড-১৯'এর দ্বিতীয় তরঙ্গ আছড়ে পড়বে, ফের লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে আক্রান্তের সংখ্যা, এমনটাই জানিয়েছেন গবেষকরা। লকডাউনের বিধিনিষেধ শিথিল করার পর, ভারত কীভাবে শারীরিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারে, তার উপর এই দ্বিতীয় তরঙ্গে সংক্রমণের পরিমাণ নির্ভর করবে।

২৫ মার্চ দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণার সময় ভারতে কোভিড-১৯ মামলার সংখ্যা ছিল ৬১৮ জন, আর মৃত্যু হয়েছিল  , যখন ১৩ জনের। শুক্রবার পর্যন্ত কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী মামলার সংখ্যা হয়েছে, ২৩,০৭৭ আর কোভিড-১৯'এর কারণে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১৮। তবে ভালো খবর হল, আক্রান্তের সংখ্যা  দ্বিগুণ হওয়ার হার লকডাউনের আগে ছিল ৩.৪ দিন, এখন ৭.৫ দিন হয়ে গিয়েছে। ১৮ টি রাজ্যে এর থেকেও ভালো পরিসংখ্যান। গত ১০ দিনে সুস্থ হওয়ার হারও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে।

এইসব পরিসংখ্যানে অনেকেই মনে করছেন, করোনার বিদায়ঘন্টা বাজছে। কিন্তু, বিজ্ঞানীরা বলছেন, টিকা আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত কোনওভাবেই শিথিলতা চলবে না। শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সমিত ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে ভারতের দৈনিক নতুন আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাটা আর বাড়ছে না। এখান থেকে নিচের দিকে নামবে, অর্থাৎ নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমতে থাকবে। তবে এরপর আবার করোনভাইরাসে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে পারে, যা দ্বিতীয় তরঙ্গ হিসাবে বিবেচিত হবে। বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (আইআইএসসি)-এর অধ্যাপক রাজেশ সুন্দরসন এই বিষয়ে একমত। তিনি জানিয়েছেন, লকডাউন ওঠার পরই যে সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করে, তা চিনে এখনই কিছুটা হলেও দেখা যাচ্ছে।

সমিত ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, চিন এবং ইউরোপের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রথম ধাক্কায় আক্রান্ত হওয়ার পর যাঁরা সুস্থ হয়ে গিয়েছেন, তাঁদের ফের আক্রান্ত হয়েছেন। এমন কোনও প্রমাণ নেই, প্রথম তরঙ্গের সংক্রমণে শরীরে যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়, তা দ্বিতীয় সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর হবে। আর তাই দ্বিতীয় তরঙ্গে ফের পুরো জনসংখ্যার ফের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকছে।

এই সপ্তাহে প্রকাশিত তাদের গবেষণায়, আইআইএস এবং টাটা ইন্সস্টিটিউট ফর ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ-এর গবেষকরা কোভিড-১৯ মহামারি রোখার ক্ষেত্রে, বিচ্ছিন্নতা, হোম কোয়ারেন্টাইন, সামাজিক দূরত্ব, লকডাউনের বিধিনিষেধ - এইরকম বিভিন্ন কৌশলগুলির প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। বেঙ্গালুরু এবং মুম্বইয়ের এই দুই প্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণায় বোঝা গিয়েছে, এই সবকটি পদক্ষেপের প্রভাব কিছু সময়ের জন্য কার্যকর থাকবে। তাই সংক্রমণের দ্বিতীয় তরঙ্গ আসার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

এই অবস্থায় তাঁরা বলছেন, লকডাউনের জন্য পাওয়া মূল্যবান সময়টাকে যতটা সম্ভব কাজে লাগাতে হবে। এই সময় আক্রমণাত্মকভাবে রোগীদের যোগাযোগগুলি খুঁজে বের করতে হবে। যত বেশি সম্ভব পরীক্ষা করে যেতে হবে। কোয়ারেন্টাইন, এবং বিচ্ছিন্নকরণের সঙ্গে সঙ্গে আরও ভালো স্বাস্থ্যবিধির অনুশীলন করতে হবে। আর অবশ্যই এই সময়ের মধ্যেই সন্ধান করতে হবে টিকার। আর এই সবকিছু চালিয়ে যেতে হবে লকডাউনের পরও। কখন এবং কীভাবে লকডাউন তোলা হবে সেই সিদ্ধান্তটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

তবে এটা পরিষ্কার যে মহামারিটি পর্যায়ক্রমে হতে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, যে কোনও সংক্রামক রোগই ছড়ায় সংক্রামিত ব্যক্তির থেকে সেই সংক্রমনে সংবেদনশীল মানুষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে। মহামারির ক্ষেত্রে কোনও যতক্ষণ না প্রত্যেক সংক্রামিত ব্যক্তির থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর হার অন্তত একজনের বেশি না হয় ততক্ষণ তার প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলে। সংক্রমণের ফলে পর্যাপ্ত লোকের মধ্যে সেই রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলে সংক্রামিত করার মতো আর লোক তাকে না এবং ধীরে ধীরে প্রকোপটি দূর হয়।।

কীটনাশক ইনজেকশন থেকে শরীরে ইউভি-রে, 'ডাক্তার ট্রাম্প'-এর পরামর্শে বিজ্ঞানী মহলে আতঙ্ক

লাগবে একটা এক্স-রে স্ক্যান, ৫ সেকেন্ডেই কোভিড-১৯ রোগী ধরবে আইআইটির সফটওয়্যার

সামনে এল করোনার নতুন উপসর্গ, ডাক্তারদের নজর এবার পায়ের দিকে

যখন লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব এবং অন্যান্য হস্তক্ষেপের ফলে প্রাদুর্ভাবটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়, তখন জনসংখ্যার একটি অল্প অংশই সংক্রামিত হয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এরপর নিয়ন্ত্রণগুলি শিথিল করা হলে সংক্রমণ ফের শুরু হয়, এবং দ্বিতীয় তরঙ্গ হিসাবে আছড়ে পড়ে। এরমধ্যে আরও সমস্যা তৈরি করতে পারে বর্ষা। বর্ষাকাল ভারতের অনেক জায়গাতেও ফ্লু-এর মরসুম। তাই গবেষকরা বলছেন, সেই সময়ই কোভিড-১৯ চরম আকার নিতে পরে ভারতে। ফ্লু-এর সঙ্গে কোভিড-১৯ মিলেমিশে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে অবস্থা।

কাজেই টিকা না বের হওয়া পর্যন্ত ভারতীয়দের সতর্ক থাকতে হবে। লকডাউন তোলার পরও দেশের কোনও অঞ্চলে সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করলেই সেই অঞ্চলের লোকদের জন্য স্থানীয়ভাবে কোয়ারেন্টাইন করতে হবে। আর লক্ষণ আছে কি নেই তা না দেখে ব্যপকভাবে পরীক্ষাও চালিয়ে যেতে হবে।