হেগে প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং রব জেটেনের বৈঠকের পর ভারত-নেদারল্যান্ডস সম্পর্ক হঠাৎ করেই ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’-এ পরিণত হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন, প্রতিরক্ষা এবং AI সংক্রান্ত এই চুক্তিগুলো সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে। ভারত কি এবার ইউরোপে প্রযুক্তি ও শক্তির নতুন পাওয়ার সেন্টার হয়ে উঠছে?
India Netherlands Strategic Partnership: আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চ থেকে একটা দারুণ চাঞ্চল্যকর খবর সামনে আসছে, যা ভারতের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দু'দিনের নেদারল্যান্ডস সফর ইউরোপ-সহ গোটা বিশ্বের বাজারে রীতিমতো তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। হেগ-এ ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেটেনের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর ভারত ও নেদারল্যান্ডস তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে 'স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ'-এর সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে গেছে, যা গত কয়েক দশকেও কল্পনা করা যায়নি। এই বিশাল চুক্তির সরাসরি প্রভাব পড়বে সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন এবং অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর।

![]()
যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় 'চিপ কিং' ভারতের সঙ্গে হাত মেলাল
এই গোটা সফরের সবচেয়ে বড় এবং চমকে দেওয়ার মতো ঘটনাটি হল সেমিকন্ডাক্টর ও মাইক্রোচিপ তৈরির বিশ্বের অন্যতম সেরা ডাচ কোম্পানি ASML এবং ভারতের টাটা ইলেকট্রনিক্স (Tata Electronics)-এর মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি। গুজরাটের ধোলেরা এখন বিশ্বের মানচিত্রে একটি নতুন 'চিপ হাব' হিসেবে উঠে আসার জন্য তৈরি। এই চুক্তির আওতায় নেদারল্যান্ডস ভারতের প্রথম 'ফ্রন্ট-এন্ড সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট'-এর জন্য তাদের সবচেয়ে উন্নত এবং গোপন প্রযুক্তি দেবে। টেক দুনিয়ায় এই পদক্ষেপকে একটা বড় গেম-চেঞ্জার হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এর ফলে ভারত চিপ তৈরির ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার দিকে এমন এক লাফ দিচ্ছে, যা বিশ্বের তাবড় শক্তিদের একাধিপত্য শেষ করে দেবে।
![]()
মাঝরাতের সেই সিক্রেট রাউন্ডটেবিল: ডাচ CEO-দের জন্য খোলা আমন্ত্রণ
স্ট্র্যাটেজিক আলোচনার পরেই হেগ-এ একটি হাই-প্রোফাইল 'ইন্ডিয়া-নেদারল্যান্ডস CEO রাউন্ডটেবিল'-এর আয়োজন করা হয়। এই বৈঠকে শক্তি, পরমাণু, বন্দর এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ক্ষেত্রের বড় বড় ডাচ কোম্পানিগুলো ছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদী সেখানে উপস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন: "আজকের ভারত মানেই বড় স্কেল আর স্থিতিশীলতা। পরিকাঠামো, ক্লিন এনার্জি এবং কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে বিশ্বের কোনও দেশই ভারতের গতি এবং দক্ষতার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না।"
![]()
প্রধানমন্ত্রী মোদী ডাচ কোম্পানিগুলোর সামনে ভারতের বদলে যাওয়া নিয়মকানুনের পুরো চিত্রটা তুলে ধরেন। তিনি জানান, কীভাবে ভারত ট্যাক্স, লেবার কোড এবং মহাকাশ থেকে শুরু করে পরমাণু শক্তির মতো নিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্রগুলোকেও বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য খুলে দিয়ে 'ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস'-এর পরিবেশ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তিনি পরিষ্কার বলেন, "ভারতে ডিজাইন আর ইনোভেশন করার জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আর হতে পারে না।"
গ্রিন হাইড্রোজেনের সেই গোপন এজেন্ডা, যা এশিয়ার শক্তি-রাজনীতি বদলে দেবে
এই স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপের দ্বিতীয় সবচেয়ে রহস্যময় এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হল 'গ্রিন হাইড্রোজেন করিডোর'। দুটি দেশই উন্নত ম্যানুফ্যাকচারিং এবং ক্লিন এনার্জি ক্ষেত্রে হাত মিলিয়েছে। নেদারল্যান্ডসের হাতে থাকা লজিস্টিকস এবং সমুদ্র পরিকাঠামোর (বন্দর) দক্ষতাকে যখন ভারতের বিশাল ট্যালেন্ট পুল এবং ভৌগোলিক ক্ষমতার সঙ্গে মেলানো হবে, তখন এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে ক্লিন এনার্জির এক নতুন করিডোর তৈরি হবে। এই করিডোর চিরাচরিত তেল-রাজনীতিকে চিরদিনের জন্য ভেঙে দিতে পারে।
![]()
ভারত-EU মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির রাস্তা কি পরিষ্কার হল?
এই বৈঠকের আরও একটি বড় রাজনৈতিক দিক হল, দুই প্রধানমন্ত্রীই 'ভারত-ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি' (India-EU FTA) দ্রুত কার্যকর করার পক্ষে জোর সওয়াল করেছেন। নেদারল্যান্ডসকে ইউরোপের প্রবেশদ্বার বলে মনে করা হয়, এবং ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেটেনের ভারতের পক্ষে দাঁড়ানোটা একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত যে, আগামী দিনে ভারতীয় পণ্যের জন্য ইউরোপের বাজার পুরোপুরি খুলে যেতে চলেছে। এখন গোটা বিশ্বের নজর গুজরাটের ধোলেরা এবং ভারতের ক্লিন এনার্জি প্রজেক্টগুলোর দিকে, যেখানে ডাচ প্রযুক্তি আর ভারতীয় গতি একসঙ্গে ইতিহাস গড়তে চলেছে।

