শত্রুপক্ষের ড্রোনের নিশানায় কি ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলো? সেই কারণেই কি সরকার হাই অ্যালার্ট জারি করেছে? সীমান্ত, বন্দর, বিমানবন্দর এবং সেনা ছাউনিতে অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম বসানো কি বড় কোনও বিপদের ইঙ্গিত? BSF, CISF, DRDO এবং IB-র যৌথ টিম কি দেশজুড়ে সুরক্ষা কবচ তৈরি করছে?
India Drone Attack Alert: ভারতের জাতীয় সুরক্ষা নিয়ে কেন্দ্র সরকার একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এবং গুরুতর সতর্কবার্তা জারি করেছে। একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, জাহাজ ও জলপথ মন্ত্রকের সামুদ্রিক সুরক্ষা শাখা (maritime security wing) দেশের স্থল এবং সমুদ্র সীমান্তের কাছাকাছি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তি এবং কৌশলগত ঘাঁটিগুলিতে ড্রোন হামলার (Drone Attack) বিষয়ে একটি বড়সড় অ্যালার্ট জারি করেছে। মন্ত্রকের জারি করা সরকারি চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, বিশ্বের বর্তমান উত্তাল পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে শত্রুপক্ষের বিপজ্জনক ড্রোন আমাদের জরুরি ঘাঁটিগুলির কাজকর্ম পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিতে পারে। এই তথ্যের পরেই সরকার সমস্ত নিরাপত্তা সংস্থাকে দ্রুত ठोस পদক্ষেপ নিতে এবং সীমান্তে অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম বসানোর নির্দেশ দিয়েছে।

ভারতের 'ব্রহ্মাস্ত্র': শত্রুর উড়ন্ত ঘাতককে আকাশেই শেষ করে দেবে এই দেশীয় সুরক্ষা কবচ
এই বড় বিপদ সামলাতে ভারত তার সীমান্ত এবং সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে অত্যাধুনিক অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি বসানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে। ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (DRDO)-এর তৈরি D-4 অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমটি রাডার, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি সেন্সর এবং বিশেষ ক্যামেরা দিয়ে সজ্জিত। এটি ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার দূর থেকেই ড্রোনকে চিহ্নিত করে তার জিপিএস (GPS) এবং কমিউনিকেশন লিঙ্ক পুরোপুরি জ্যাম করে দিতে পারে। এই সিস্টেম লালকেল্লা এবং প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাতেও মোতায়েন করা হয়েছে।

ভারতের প্রধান কয়েকটি অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম
১. ডি-৪ অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম (DRDO)
- শনাক্তকরণের রেঞ্জ: ৩-৫ কিমি, জ্যামিং রেঞ্জ: ১-২.৫ কিমি
- রাডার, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি সেন্সর ও ক্যামেরার সাহায্যে ড্রোন চিহ্নিত করে
- GPS ও কমিউনিকেশন লিঙ্ক জ্যাম করে ড্রোনকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়
- লালকেল্লা ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার মতো হাই-সিকিউরিটি জোনে মোতায়েন
২. আকাশতীর কাউন্টার-ইউএএস সিস্টেম
- নজরদারির রেঞ্জ: প্রায় ১৫ কিমি
- ভারতীয় সেনার নেটওয়ার্ক-ভিত্তিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম
- ড্রোন, মিসাইল ও অন্যান্য উড়ন্ত বিপদকে রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করতে পারে
- সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ব্যাপকভাবে মোতায়েন
৩. ভার্গবস্ত্র মাইক্রো-মিসাইল সিস্টেম
- কার্যকরী রেঞ্জ: প্রায় ২.৫ কিমি
- ড্রোনের ঝাঁককে (swarm) ধ্বংস করতে সক্ষম
- একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে
- হার্ড-কিল প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে তৈরি

৪. জেন অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম
- রেঞ্জ: মডেল অনুযায়ী ৪-৮ কিমি
- ড্রোন চিহ্নিত করা, ট্র্যাক করা এবং নিষ্ক্রিয় করার ক্ষমতা রয়েছে
- RF জ্যামার এবং AI-ভিত্তিক ডিটেকশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে
- সেনা এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলি এটি ব্যবহার করে
৫. বিইএল কাউন্টার-ড্রোন সিস্টেম
- রেঞ্জ: প্রায় ১০ কিমি
- রাডার-ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা
- RF এবং GNSS জ্যামিং করার ক্ষমতা রয়েছে
- সংবেদনশীল পরিকাঠামোর সুরক্ষার জন্য তৈরি
৬. বস্ত্র সেন্টিনেল অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম
- শনাক্তকরণের রেঞ্জ: ১০+ কিমি
- AI-ভিত্তিক ড্রোন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি
- ড্রোনের ঝাঁককে ট্র্যাক এবং মনিটর করতে পারে
- সীমান্ত ও কৌশলগত এলাকার সুরক্ষার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে
ভারতের এই অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমগুলি আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত, যা শত্রুপক্ষের ড্রোনকে চিহ্নিত করতে, ট্র্যাক করতে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে এবং প্রয়োজনে সেগুলিকে নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করতে সক্ষম।

BSF-CISF-এর যৌথ অভিযান: পঞ্জাব সীমান্তে ট্রায়াল শুরু, কোন সিস্টেম সামলাবে দায়িত্ব?
আকাশপথে এই সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ রুখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (BSF)-এর অধীনে একটি উচ্চ-পর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির তত্ত্বাবধানে BSF পাকিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন পঞ্জাবের সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে এই অত্যাধুনিক সিস্টেমগুলি বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে ইতিমধ্যেই ফিল্ড ট্রায়াল শুরু হয়ে গিয়েছে। এর পাশাপাশি, সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স (CISF) একটি যৌথ দল তৈরি করেছে, যেখানে DRDO, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (IB), এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (AAI) এবং BSF-এর শীর্ষ আধিকারিকরা রয়েছেন। এই দলটি দেশের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর এবং ভিভিআইপি এলাকা পরিদর্শন করছে। তাদের চূড়ান্ত রিপোর্টের ভিত্তিতেই ঠিক হবে কোন সংবেদনশীল জায়গায় কোন অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম বসানো হবে।
দেশের প্রথম কোন বন্দরে অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম বসল?
ড্রোনের বিপদ মোকাবিলার এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে তামিলনাড়ুর থুথুকুড়িতে অবস্থিত ভি.ও. চিদাম্বরানার পোর্ট দেশের প্রথম বন্দর হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেছে, যেখানে এই সুরক্ষা কবচ বসানো হয়েছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ এই বন্দরের সুরক্ষার জন্য সরকারি সংস্থা 'সেন্ট্রাল ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড'-এর সঙ্গে একটি চুক্তি করে অ্যাডভান্সড অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম অ্যাক্টিভেট করা হয়েছে। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এবং রাডারের উপর ভিত্তি করে তৈরি এই সিস্টেমটি বন্দরের উপকূলীয় পরিবেশের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা ৩৬০-ডিগ্রি অর্থাৎ চারদিকে নজর রাখবে। এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপটি সরকারের 'অমৃত কাল ভিশন ২০৪৭' এবং 'মেরিটাইম ইন্ডিয়া ভিশন ২০৩০'-এর অধীনে দেশের সামুদ্রিক ও আকাশপথের নিরাপত্তাকে দুর্ভেদ্য করে তোলার জন্য নেওয়া হয়েছে।

অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম কী?
শত্রুপক্ষের ড্রোন চিহ্নিত করতে, তাদের ট্র্যাক করতে এবং নিষ্ক্রিয় করার জন্য অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হল:
- আকাশপথে নজরদারি চালানো।
- সংবেদনশীল এবং কৌশলগত স্থানগুলির সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
- ড্রোনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া সম্ভাব্য বিপদ প্রতিরোধ করা।
অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম কীভাবে কাজ করে?
- প্রথমে আকাশে থাকা ড্রোনের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়।
- তারপর তার ধরন, গতি এবং দিক চিহ্নিত করা হয়।
- এরপরে জ্যামিং প্রযুক্তি বা অন্য কোনও প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে ড্রোনটিকে নিষ্ক্রিয় করা হয়।
কোথায় ব্যবহার হয় অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম?
- বিমানবন্দর, সীমান্তবর্তী এলাকা এবং সেনা ঘাঁটিতে।
- গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনের নিরাপত্তায়।
বড় ধরনের পাবলিক অনুষ্ঠান এবং ভিড়ের মধ্যে। উদাহরণ:
- আয়রন ডোম (ইজরায়েল)
- ডি-ড্রোন ড্রোন ট্র্যাকার (জার্মানি/আমেরিকা)
- স্কাইলক ড্রোন শিল্ড (আমেরিকা/ইজরায়েল)
- VSHORAD কাউন্টার-ড্রোন সিস্টেম (ভারত)


