দিল্লিতে সিজেপি-র বিক্ষোভ ঘিরে ধরপাকড় নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিশনের উদ্বেগ খারিজ করল ভারতের বিদেশ মন্ত্রক। মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, দেশের আইন মেনেই পুলিশ পদক্ষেপ করেছে।
দিল্লিতে সিজেপি-র (CJP) প্রস্তাবিত বিক্ষোভ ঘিরে কড়া নিরাপত্তা ও ধরপাকড় নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিশনের মন্তব্য খারিজ করল ভারত। রবিবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট জানিয়েছেন, দেশের আইন মেনেই পুলিশ ও প্রশাসন পদক্ষেপ করেছে।
সিজেপি-র বিক্ষোভ নিয়ে বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিক্রিয়া
এক্স (X) হ্যান্ডেলে পোস্ট করা একটি ভিডিও বার্তায় বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র বলেন, ভারতের সংবিধান শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার দেয়। আর দেশের বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সেই অধিকার রক্ষা করে।
তিনি বলেন, "নয়াদিল্লিতে গতকালের ঘটনা নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিশনের (OHCHR) কিছু মন্তব্য আমাদের নজরে এসেছে। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। আমাদের সংবিধানে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সুনিশ্চিত করা আছে। স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত সংবাদমাধ্যম এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো সেই অধিকার রক্ষা করে।"
তবে একইসঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার শর্তেই এই অধিকার ভোগ করা যায়। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই পদক্ষেপ করেছে।
রাষ্ট্রসংঘের উদ্বেগ অযৌক্তিরঃ বিদেশ মন্ত্রক
নাগরিকদের কোনও অভিযোগ থাকলে তা শোনার জন্য দেশের আদালত রয়েছে। এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিশনের উদ্বেগকে 'অযৌক্তিক' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র।
তাঁর কথায়, "যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশের মতোই ভারতীয় নাগরিকরা জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার শর্তে এই অধিকার প্রয়োগ করেন। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরোপুরি আইন মেনেই কাজ করে। কারও কোনও অভিযোগ থাকলে তা জানানোর জন্য আদালত তো খোলাই আছে। তাই OHCHR-এর এই উদ্বেগ একেবারেই অযৌক্তিক। এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ।"
রাষ্ট্রসংঘের প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিদেশমন্ত্রকের প্রশ্ন
বিক্ষোভ সামলানো নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার সংস্থার 'দ্বিমুখী নীতি' নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জয়সওয়াল। তিনি বলেন, ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিক্ষোভ দমনে যখন চরম হিংসার আশ্রয় নেওয়া হয়, তখন এরা চুপ থাকে। এমনকী নিজেদের সদর দফতরের আশেপাশে পুলিশের কড়া পদক্ষেপ নিয়েও তারা কোনও মন্তব্য করে না।
জয়সওয়াল বলেন, "আমরা দেখছি, প্রকাশ্যে কোনও অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে OHCHR চরম পক্ষপাতিত্ব করে। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিক্ষোভের ওপর হিংসাত্মক দমনপীড়ন নিয়ে তারা টুঁ শব্দ করে না। এমনকী নিজেদের এলাকার আশেপাশে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়েও তারা নীরব থাকে।"
তিনি আরও বলেন, "এই ধরনের দ্বিচারিতা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। এর ফলে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়।"
ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) বিক্ষোভের আগে ও চলাকালীন দিল্লিতে বহু আন্দোলনকারী, ছাত্রনেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, আইনজীবী এবং সাংবাদিকদের আটক করা হয়। এই ধরপাকড় নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার দফতর উদ্বেগ প্রকাশ করার পরেই ভারতের তরফে এই কড়া জবাব দেওয়া হল।
রাষ্ট্রসংঘের প্রতিক্রিয়া
রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক মুখপাত্র থামিন আল-খিতান একটি বিবৃতিতে বলেন, সমাবেশের অধিকারকে সম্মান জানানো উচিত। যাঁদের 'বেআইনিভাবে' আটক করা হয়েছে, তাঁদের 'অবিলম্বে এবং নিঃশর্তে' মুক্তি দেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশকে সংযত আচরণ করার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি, বিক্ষোভে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে তা কতটা জরুরি এবং যুক্তিসঙ্গত, তা নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি। বিবৃতিতে বলা হয়, "দিল্লিতে আজকের বিশাল বিক্ষোভের আগে ও চলাকালীন আন্দোলনকারী, নেতা, সুশীল সমাজের সদস্য, আইনজীবী এবং সাংবাদিকদের গণহারে আটক করার খবরে আমরা উদ্বিগ্ন।"
বিক্ষোভকারীদের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনারও আহ্বান জানায় রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার দফতর। তারা বলে, "বিক্ষোভকারীদের উদ্বেগ দূর করতে আমরা প্রশাসনকে অর্থবহ আলোচনায় বসার অনুরোধ জানাচ্ছি।"
ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) বা বিশেষ সংশোধনীতে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপি-র নেতৃত্বে যন্তর মন্তর অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় গোটা দিল্লি জুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় চলে। তার প্রেক্ষিতেই এই বিবৃতি দেয় রাষ্ট্রসংঘ।
দিল্লিতে বিক্ষোভ
দিল্লি পুলিশ সূত্রে খবর, বিক্ষোভস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় রাজধানী জুড়ে প্রায় ১,০০০ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। আন্দোলনকারীদের আটকাতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে কড়া নিরাপত্তা মোতায়েন করে পুলিশ। চালানো হয় জোরদার নাকা তল্লাশি। আটক হওয়া নেতাদের মধ্যে ছিলেন আম আদমি পার্টির (AAP) জাতীয় আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (AISA) নেত্রী নেহা বোরা। সিজেপি কর্মী অভিজিৎ ডিপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা এবং সিজেপি-র লিগ্যাল হেড রত্না সিংকেও আটক করা হয়। এছাড়া দিল্লি ও অন্যান্য জায়গা থেকে আরও বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ।


