গত কয়েকদিন ধরে প্রায় প্রতিদিনই কাশ্মীরে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে চলেছে পাকিস্তান। এবার সেই পথে হাঁটল চিনও। ভারতীয় সেনা জানাচ্ছে, লাদাখের গালোয়ান উপত্যকা থেকে পিছিয়ে আসছিল ভারতীয় সেনা। সেই সময় সোমবার রাত্রে অতর্কিতে গুলিবর্ষণ শুরু করে অপরপ্রান্তে থাকা চিনা সেনা। আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায় ভারতীয় জওয়ানরাও। চিনা সেনার গুলিতে শহিদ হন  ভারতীয় সেনার ১ আধিকারিক ও ২ জ‌ওয়ান। অন্য দিকে চিনকেও প্রত্যুত্তর দেওয়া হয়েছে বলে জানাচ্ছে ভারতীয় বাহিনী।

গত কয়েকদিন ধরেই লাদাখ সীমান্ত নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে রয়েছে দুই দেশের সম্পর্ক। তার মধ্যে এই ঘটনা নতুন করে ঘি ঢালতে শুরু করেছে। এদিকে চিন যুদ্ধ বিরতি লঙ্ঘনের পর  চিফ অফ আর্মি স্টাফ বিপিন রাওয়াত ও তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করছেন কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ও বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। গোটা পরিস্থিতি ইতিমধ্যে নরেন্দ্র মোদীকে জানিয়েছেন প্রতিক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল।

যখন উত্তেজনা প্রশমনের প্রক্রিয়া চলছে বলে দাবি করছে দুই দেশের সরকার তখন এই সংঘর্ষ বিরতি সব হিসেব গণ্ডগোল করে দিয়েছে। তবে শেষপাওয়া খবর অনুযায়ী দু'পক্ষের সেনা আধিকারিকরাই ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন।

১৯৬৭ সালের পর এই প্রথমবার লাদাখে ভারত-চিন সংঘাতে কোনও ভারতীয় সেনা প্রাণ হারালেন। শান্তি আলোচনার কথা বলা হলেও আদতে যে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে লাদাখে তার আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল গত কয়েকদিন ধরেই। 

বস্তুত গত বছর ভারত সরকার লাদাকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার পর থেকেই চিনের আস্ফালন বৃদ্ধি পেয়েছে। এই এলাকাকে নিজেদের দখলে করতে চাইছে চিন। গত  মে মাসের গোড়াতেই পূর্ব লাদাখের গলওয়ান উপত্যকা, নাকু লা এবং প্যাগং লেকের উত্তরপ্রান্তে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) পেরিয়ে ভারতীয় এলাকায় কয়েক কিলোমিটার অনুপ্রবেশ করে চিনা ফৌজ ঘাঁটি গেড়ে বসে। খবর পেয়ে তাদের মুখোমুখি মোতায়েন হয় ভারতীয় সেনা। তার পর থেকে দফায় দফায় সেনাস্তরের বৈঠকেও জট কাটেনি। বেশ কয়েকবার দু’তরফের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।

এই অবস্থায় মে মাসের শেষের দিকে সীমান্ত সমস্যা মেটাতে চিন ও ভারতকে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও সেই প্রস্তাব দুই দেশই ফিরিয়ে দেয়। তার বদলে গত ৬ জুন দুই দেশের মধ্যে কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়।  ভারতের তরফে সেই বৈঠকের  নেতৃত্ব দিয়েছিলেন  লেফটেন্যান্ট জেনারেল হরিন্দর সিং। অন্যদিকে চিনের তরফে ছিলেন তিব্বত মিলিটারি ডিস্ট্রিক্টের কমান্ডার। বৈঠক হবে চুসুল-মালডোতে।

এদিকে সেনাবাহিনী এবং কূটনৈতিক মহলের মধ্যে  আলোচনা চললেও সীমান্তে চিনের মত শক্তি জোরদার করছিল ভারতও। যদিও গত শনিবার সেনাপ্রধান এমএম নারাভানে জানিয়েছিলেন যুদ্ধ নয়, বরং কথাবার্তা-বৈঠকের মাধ্যমেই ভারত-চিন সীমান্তের সমাধানসূত্র বের করতে চান তিনি। এখন সীমান্ত সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রনে রয়েছে এমনটাই জানিয়েছিলেন  সেনাপ্রধান নারাভানে। তিনি বলেছিলেন, “আমি সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই যে চিনের সঙ্গে আমাদের সীমান্তে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল সেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা একাধিক আলোচনা শুরু করেছি। লোকাল কমান্ডারদের সঙ্গে নিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক বৈঠকও হয়েছে। তবে হ্যাঁ অনেক বৈসাদৃশ্য রয়েছে মত-এ। তবে আমরা আশাবাদী যে কথোপকথনের মাধ্যমে ভারত ও চিন তাঁদের এই পার্থক্যগুলি মিটিয়ে নিতে সক্ষম। এখন সবটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”

রবিবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং একটি ভার্চুয়াল জনসভায় বলেন, “চিন চাইছে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা ইস্যু নিয়ে কথাবার্তা বলতে। যদিও আমরা সামরিক এবং কূটনৈতিক স্তরেই আলোচনা জারি রাখব।”

চিন এবং ভারতের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে বিরোধ নতুন কোনো বিষয় নয়, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এখন হঠাৎ করে এই করোনাভাইরাস মাহমারীর ভেতর এই সঙ্কট শুরু হলো কেন? এই বিষয়ে রাজনৈতির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারীতে সারা বিশ্ব যখন ব্যতিব্যস্ত তখন দুনিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য  চিন বেশ কিছুদিন ধরে চেষ্টা চালাচ্ছে।  শুধু ভারত সীমান্তে চাপ তৈরি নয়, হংকংয়ে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠাতেও আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে চিন।

আর লাদাখ সীমান্তের গালোয়ান উপত্যকায় গত কয়েকবছর ধরে ভারত যেভাবে রাস্তাঘাট সহ পরিকাঠামো তৈরি করছে তাতে চিন সত্যিই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। ভারতে ক্ষমতায় আসা  কট্টর জাতীয়তাবাদী সরকারের সঙ্গে  যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক এবং রাজনৈতিক নৈকট্যেও বেইজিংয়ের উদ্বেগ দিনে দিনে আরো বাড়িয়েছে। তাই সোমবার  দু’পক্ষের ব্রিগেডিয়ার পর্যায়ের বৈঠক শুরু হওয়ার পরেই  চিনের এই হামলা নতুন করে আশঙ্কার মেঘ ঘনাচ্ছএ সীমান্তে।