কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের ঘোষণা অনুযায়ী, খুব শিগগিরই শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত হতে চলেছে এলআইসি। এতদিন এলআইসি-র একশো শতাংশ অংশীদারিত্বই ছিল ভারত সরকারের হাতে। এবার তার একাংশ আমজনতার কেনার জন্য শেয়ার বাজারে ছাড়বে সরকার। যার ফলে সরকারের ঘরে আসবে বিপুল পরিমাণ অর্থ। 

এলআইসি নিয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তের পরেই কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন সংস্থার পলিসি হোল্ডার-রা। সবার মনেই প্রশ্ন, এলআইসি-তে বিনিয়োগ করা অর্থ নিরাপদ থাকল তো? কারণ এতদিন এলআইসি-তে কেউ পলিসি করলে তার বিনিয়োগ করা অর্থ এবং সেই পলিসিতে এলআইসি-র ঘোষিত বোনাস ফেরত দেওয়ার 'গ্যারান্টি' দিত সরকার।  এর জন্য় আইনও রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এলআইসি-র  বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্তের পর কি সেই সুবিধে পাবেন পলিসি হোল্ডাররা? মোট কথা, এলআইসি-র বিলগ্নিকরণের কী প্রভাব সংস্থার পলিসি হোল্ডার-দের উপরে পড়বে?


একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ বাজারের সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের কাছে এই প্রশ্ন করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা যে মতামত দিচ্ছেন, তাতে আশ্বস্ত হতেই পারেন এলআইসি-তে বিনিয়োগকারীরা। অধিকাংশেরই মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্তে আখেরে পলিসি হোল্ডার- দেরই ভাল হবে।

নিজেদের দাবির স্বপক্ষে মূলত নিম্নলিখিত কারণগুলি তুলে ধরছেন বিশেষজ্ঞরা-

প্রকাশ্যেই থাকবে সংস্থার আর্থিক হাল

এতদিন পুরোদস্তুর সরকারি নিয়ন্ত্রাণাধীন থাকায় এলআইসি-র আর্থিক স্বাস্থ্যের হালহকিকত নিয়ে কোনও খবরই পেত না আমজনতা। এলআইসি-র অধিকাংশ পলিসি-ই যেহেতু বাজারের ওঠানামার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় (যেমনটা ইউলিপ বা মিউচুয়াল ফান্ড- এর ক্ষেত্রে হয়), তাই সংস্থার আর্থিক অবস্থা নিয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা সম্ভব হতো না পলিসি হোল্ডার-দের পক্ষে। এলআইসি শেয়ার মার্কেট- এ নথিভুক্ত হওয়ায় এবার সব পলিসি হোল্ডারই সংস্থার আর্থিক অবস্থা জনসমক্ষেই থাকবে। সরাসরি সেবি-র নজরদারিতে থাকবে এলআইসি। 

বিনিয়োগের উপর গ্যারান্টি অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা

বিলগ্নিকরণ হলেও সংস্থার সিংহভাগ অংশিদারিত্ব এখনও সরকারের হাতেই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সংস্থা এখন বিনিয়োগ করা অর্থ এবং বোনাস- এর উপরে যে 'গ্যারান্টি' পলিসি হোল্ডার-দের দেয়, তা অপরিবর্তিত থাকবে বলেই আশ্বস্ত করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও এই শেয়ার বাজারে এলআইসি নথিভুক্ত হওয়ার পরে এই 'গ্যারান্টি' আর থাকবে কি না, তা নিয়ে কয়েকজন বাজার বিশেষজ্ঞ সংশয়ও প্রকাশ করেছেন। সেক্ষেত্রে এলআইসি-র উপরে গ্রাহকদের আস্থা কমতে বাধ্য। 

আরও পড়ুন- 'আমি স্তম্ভিত', মোদী সরকারের বাজেটে কড়া প্রতিক্রিয়া মমতার

আর পড়ুন- পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত কোনও আয়কর নয়, শর্তস্বাপেক্ষে ছাড় বাড়ালেন নির্মলা

অনুৎপাদক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কমবে
এতদিন সরকারের কাছে এলআইসি ছিল গৌরী সেন-এর মতো। তাই ধুঁকতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা থেকে শুরু করে আইডিবিআই-এর মতো অলাভজনক ব্যাঙ্ক-কে বাঁচাতে বার বার এলআইসি- কে অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়েছে। বলা ভাল, সরকারের নির্দেশেই তা করতে হয়েছে। কিন্তু এই ধরনের বিনিয়োগ এলআইসি-র পক্ষে কতটা লাভজনক বা পলিসি হোল্ডার-দের স্বার্থের পক্ষে, তা নিয়ে বার বার প্রশ্ন উঠেছে। এখন থেকে যেহেতু এলআইসি-র অংশিদারিত্ব শেয়ার বাজারে ছাড়া হচ্ছে, তাই আর্থিকভাবে লাভজনক ক্ষেত্র ছাড়া এলআইসি-র অন্যত্র বিনিয়োগ করার সম্ভাবনা অনেকটাই কমবে। যা সংস্থার আর্থিক অবস্থাকেই মজবুত করবে। আখেরে যা এলআইসি-র পলিসি হোল্ডার-দেরই পক্ষেই যাবে। 

 

স্বচ্ছতা বাড়বে, সংস্থার আর্থিক স্বাস্থ্য ভাল হবে

যে কোনও সংস্থার অংশীদারিত্ব আমজনতার হাতে আসা মানেই তাতে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি পায়। এলআইসি-র ক্ষেত্রেও তাই হবে। শৃঙ্খলাপরায়ণ হওয়ায় আর্থিক দিক দিয়ে সংস্থা স্থায়িত্ব পাবে বলেই মনে করছেন প্রায় সব বিশেষজ্ঞই। শেয়ার বাজারে সংস্থার মূল্য বাড়াতে আরও ভাল ব্যবসা করতে হবে এলআইসি-কে। তার জন্য সংস্থার মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব বাড়বে। বাজার ধরার তাগিদেই সংস্থা সস্তায় আরও ভাল সুবিধে যুক্ত পলিসি বাজারে ছাড়বে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। 

কমতে পারে মেয়াদ উত্তীর্ণ সময়ে টাকার পরিমাণ

এতদিন এলআইসি নিজে লভ্যাংশ খুব কম রেখে লাভের বেশির অংশই বোনাস হিসেবে গ্রাহকদের মধ্যে ভাগ করে দিত। মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর টাকা পাওয়ার সময় যার সুফল পেতেন গ্রাহকরা। শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত হওয়ার পরেও  বোনাস এবং বিনিয়োগ করা অর্থের উপরে গ্যারান্টি অপরিবর্তিত থাকলে গ্রাহকদের বিশেষ চিন্তার কারণ নেই। তবে বাজারে অংশীদারিত্ব ছাড়ার পরে সংস্থার ঝুঁকি কমাতেই  এলআইসি পলিসি-তে মেয়াদ উত্তীর্ণ অর্থের পরিমাণ কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন কিছু বিশেষজ্ঞ। তবে শেষ পর্যন্ত সরকার এলআইসি-র কতটা অংশীদারিত্ব হাতছাড়া করে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে শেয়ার বাজার।