নির্বাচন কমিশন এবং এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে মুম্বইয়ের শিবাজি পার্ক ও দিল্লির যন্তর মন্তরে পথে নামল বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়েছেন তাঁরা।

নির্বাচন কমিশন এবং স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগে শুক্রবার মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে বিক্ষোভ দেখান ককরোচ জনতা পার্টি (CJP) এবং অন্যান্য নাগরিক সমাজের কর্মীরা। অন্যদিকে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে পথে নামে স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (SFI), ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (DYFI) এবং বিরোধী নেতারা।

মুম্বইতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

এই বিক্ষোভের জেরে মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়। দিল্লিতেও কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে প্রশাসন। সেখানে পুলিশ এই বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি। উল্টে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNS), ২০২৩-এর ১৬৩ নম্বর ধারায় নিষেধাজ্ঞাও জারি করে তারা।

সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে 'দেশদ্রোহী' বলে তোপ দাগেন। তিনি বলেন, জ্ঞানেশ কুমারই হলেন আসল 'দেশবিরোধী'। সৌরভের দাবি, মুম্বইয়ের এই বিক্ষোভে গোটা দেশের মানুষ সমর্থন জানাবেন। সৌরভ বলেন, "আগের বার ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গোটা দেশের যুবসমাজ রাস্তায় নেমেছিল। এবার দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা জ্ঞানেশ কুমারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে চলেছে। মুম্বইয়ের তরুণরা ফের রাস্তায় নামছেন। আজ শিবাজি পার্কে বিশাল বড় বিক্ষোভ হবে। আমি সমস্ত মুম্বইকর এবং বন্ধুদের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, আপনারা সবাই আসুন।" মুম্বইয়ে সিজেপি-র এই বিক্ষোভ নিয়ে মুখ খোলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। তিনি জানান, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর জবাব আগেই দেওয়া হয়েছে। ফড়নবিশ বলেন, "পুরো বিষয়টা সবার সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। তিন নির্বাচন কমিশনার সাংবাদিক বৈঠক করার পরেই ওদের ভুয়ো প্রচারের পর্দাফাঁস হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও, এই ভুয়ো প্রচার চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। ওরা এতে সফল হবে না।"

দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

এদিকে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশন এবং এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে যন্তর মন্তরের কাছে বিক্ষোভ দেখান এসএফআই এবং ডিওয়াইএফআই সদস্যরা। সিপিআই(এম) নেতারা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবি তোলেন। দিল্লি পুলিশ অনুমতি না দেওয়া সত্ত্বেও এই বিক্ষোভ হয়। বিএনএসএস-এর ১৬৩ নম্বর ধারায় নিষেধাজ্ঞা জারি থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা পিছু হটেননি।

বিক্ষোভে যোগ দিয়ে সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি অভিযোগ করেন, জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচন কমিশনের নিয়মকানুন ভেঙেছেন। তিনি অবিলম্বে জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবি জানান। বেবি বলেন, "মানুষের ভোট কেটে দেওয়ার মতো অপরাধমূলক কাজের জন্য জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেফতার করা উচিত।" সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বেবি জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসএফআই এবং ডিওয়াইএফআই-এর হাজার হাজার ছাত্র-যুব নেতা দিল্লিতে এসেছেন। তিনি বলেন, "যন্তর মন্তর সহ দিল্লির আরও কয়েকটি জায়গায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া এবং ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ ফেডারেশনের হাজার হাজার ছাত্র-যুব নেতা জড়ো হয়েছেন। আমার মনে হয়, আজ দিল্লিতে এটাই সবচেয়ে বড় জমায়েত।"

বেবির অভিযোগ, সিইসি কুমার নির্বাচন কমিশনের সমস্ত নিয়ম 'নির্লজ্জভাবে' ভেঙেছেন। তিনি বলেন, "উনি নিজে থেকে পদত্যাগ করছেন না, তাই ওঁকে সরিয়ে দেওয়া উচিত। ওঁকে না সরানো পর্যন্ত ছাত্র-যুবদের এই আন্দোলন চলবে।"

সিপিআই(এম) নেত্রী বৃন্দা কারাতও কুমারকে সরানোর দাবি তোলেন। পাশাপাশি এসআইআর প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করার কথাও বলেন তিনি। বৃন্দা বলেন, "আসল কথা হল সিইসি-কে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা এবং ওঁকে সরানো। উনি নিজে থেকে সরবেন না, ওঁকে সরাতে হবে। এসআইআর অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আর ২০২৩ সালের আইন বদলে নির্বাচন কমিশনকে ঠিক করতে হবে।"

এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে মধ্য দিল্লিতে বিক্ষোভ দেখান আম আদমি পার্টির নেতারাও। আপ-এর দিল্লি সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজ যন্তর মন্তরে পৌঁছে বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার পরেই তাঁকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। সৌরভ ভরদ্বাজের অভিযোগ, পুলিশ মহিলা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। আটক করার সময় পুলিশ কর্মীরা তাঁকে আঁচড়ে দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। আটক হওয়ার কয়েক মিনিট আগে সৌরভ জানান, এসএইচও সহ বিশাল পুলিশ বাহিনী তাঁর বাড়ির বাইরে মোতায়েন ছিল। এত বাধা সত্ত্বেও তিনি যন্তর মন্তরে পৌঁছেছেন। তিনি বলেন, "আমি চলে এসেছি। এসএইচও সারারাত আমার বাড়ির বাইরে বসেছিলেন। আমি বাড়িতে নেই বলার পরেও, এখনও পুলিশ কর্মীরা আমার বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।" তিনি তরুণদের বিক্ষোভস্থলে পৌঁছনোর আবেদন জানান। সৌরভ বলেন, "আমি আমার তরুণ প্রজন্ম এবং জেন-জি-কে বলতে চাই, আমি যদি কোনও গাড়ি ছাড়া মেট্রো করে এখানে পৌঁছতে পারি, তাহলে আপনারাও পারবেন।" এক্স (X) হ্যান্ডেলে একটি পোস্টে সৌরভ জানান, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে এবং আপ বিধায়ক সঞ্জীব ঝাকে আটক করা হয়েছে। তিনি সাধারণ মানুষকে শান্তিপূর্ণভাবে এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ডাক দেন।

এই বিক্ষোভকে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার লড়াই বলে উল্লেখ করেন সৌরভ। তিনি বলেন, "এটা এমন একটা লড়াই, যেখানে আমরা না লড়লে দেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সব শেষ হয়ে যাবে। তাই আপনাদের এই লড়াই লড়তেই হবে। প্রযুক্তিগত, সাংবিধানিক এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে এই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, এছাড়া আর কোনও উপায় নেই।" মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে হওয়া এই বিক্ষোভ থেকে আপ নেত্রী অতিশী, বিধায়ক কুলদীপ কুমার সহ আপ, কংগ্রেস এবং বিরোধী জোটের অন্যান্য সদস্যদেরও আটক করে দিল্লি পুলিশ।

পুলিশের নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

নয়াদিল্লিতে বিএনএসএস-এর ১৬৩ নম্বর ধারা জারি করে দিল্লি পুলিশ। এর ফলে আগাম লিখিত অনুমতি ছাড়া পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত, মিছিল, বিক্ষোভ, পিকেটিং, ধর্না, স্লোগান এবং ভাষণ দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, লাঠি, তলোয়ার বা ওই জাতীয় কোনও জিনিস বহন করার ওপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করে পুলিশ।

নয়াদিল্লির ডিসিপি শচীন শর্মা জানান, আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি সাধারণ মানুষকে পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করার আবেদন জানান। শর্মা বলেন, "নয়াদিল্লিতে বিএনএসএস-এর ১৬৩ নম্বর ধারা জারি রয়েছে। তাই কোনওরকম বিক্ষোভ, মিছিল বা জমায়েতের অনুমতি নেই। আমরা আগাম ব্যবস্থা নিয়েছি। সবাইকে আইন মেনে পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করার অনুরোধ করছি।"

যন্তর মন্তরে ডিউটিরত পুলিশ কর্মীদের আহত হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শর্মা জানান, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, "কয়েকজন আহত হয়েছেন, আমরা পুরো বিষয়টা দেখছি।" যন্তর মন্তরে পুলিশ এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (র‍্যাফ) পাশাপাশি দাঙ্গা নিয়ন্ত্রক গাড়িও মোতায়েন করা হয়। ওই এলাকার দিকে যাওয়া রাস্তাগুলোতে ব্যারিকেড বসানো হয়। ভিড় বাড়ার আশঙ্কায় অতিরিক্ত নিরাপত্তারক্ষীও চাওয়া হয়।

পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জনপথ, প্যাটেল চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, রাজীব চক, সেবা তীর্থ, মান্ডি হাউস, লোক কল্যাণ মার্গ, আইএনএ, চাউড়ি বাজার, রামকৃষ্ণ আশ্রম মার্গ এবং নয়াদিল্লি সহ মোট ১১টি মেট্রো স্টেশনের গেট বন্ধ রাখে দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন। তবে কয়েকটি স্টেশনে ট্রেন বদল করার সুবিধা চালু ছিল।নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম এবং এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের এই বিক্ষোভ বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। যন্তর মন্তরের এই বিক্ষোভে অন্যান্য বিরোধী নেতা এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোও সমর্থন জানিয়েছে।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের এই আন্দোলন চলবে বলেই খবর। ইন্ডিয়া (INDIA) জোট আগামী দিনে আরও বেশ কিছু বিক্ষোভ কর্মসূচির পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ৬ অক্টোবর একটি কর্মসূচি এবং ১ নভেম্বর দিল্লিতে একটি বড় র‍্যালির ডাক দেওয়া হয়েছে।