গান্ধী জয়ন্তী উপলক্ষে দেশজুড়ে ২ লাখ ৪২ হাজারের বেশি বিশেষ গ্রামসভা আয়োজিত হলো। এর মাধ্যমে শুরু হলো ২০২৬-২৭ সালের 'পিপলস প্ল্যান ক্যাম্পেইন'। পঞ্চায়েতের উন্নয়ন ও সরকারি নানা প্রকল্প নিয়ে সাধারণ মানুষ এখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলোচনা করেন।

গান্ধী জয়ন্তী উপলক্ষে গোটা দেশে বিশেষ গ্রামসভার আয়োজন করা হয়েছিল। জিপিডিপি (GPDP) এবং পঞ্চায়েত নির্ণয় পোর্টালে ২ লাখ ৪২ হাজারের বেশি এমন সভার শিডিউল করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, পঞ্চায়েত কর্মী ও আধিকারিকরা এই সভাগুলোতে দারুণ উৎসাহের সঙ্গে যোগ দেন।

এই বিশেষ গ্রামসভাগুলোর হাত ধরেই শুরু হলো ২০২৬-২৭ সালের 'পিপলস প্ল্যান ক্যাম্পেইন' বা 'সবকি যোজনা, সবকা বিকাশ'। এর আওতায় পঞ্চায়েতগুলো ২০২৭-২৮ অর্থবর্ষের জন্য নিজেদের উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা তৈরি করবে।

পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রক জানিয়েছে, এই ২.৪২ লাখ বিশেষ গ্রামসভায় কেন্দ্রীয় সরকারের নানা প্রকল্প নিয়ে জোরদার আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামোন্নয়ন, পানীয় জল ও পরিচ্ছন্নতা, উপভোক্তা বিষয়ক, খাদ্য ও গণবণ্টন, জলসম্পদ ও গঙ্গা পুনরুজ্জীবন এবং ভূমি সম্পদ দপ্তরের নানা উদ্যোগ ছিল আলোচনার কেন্দ্রে।

সরকারি নানা উদ্যোগ এবং স্থানীয় সমস্যা নিয়ে সরাসরি কথা বলার একটা বড় সুযোগ পেয়েছিলেন গ্রামের মানুষ। কেন্দ্রীয় অর্থ কমিশনের অনুদান কীভাবে পঞ্চায়েতগুলো পাবে, নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে কীভাবে স্বনির্ভর হওয়া যায়, জমি ও সম্পত্তির অধিকার, নিশ্চিত কর্মসংস্থান, নিরাপদ পানীয় জল, খাদ্য সুরক্ষা, উপভোক্তাদের অধিকার এবং মহিলাদের আর্থিক ক্ষমতায়নের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

গত ১২ বছরে সরকার যেসব জনমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে, তার প্রচারপত্র এই সভাগুলোতে পড়ে শোনানো হয়। গ্রামের মানুষ, পঞ্চায়েত কর্মী ও আধিকারিকরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামত শেয়ার করেন। তাঁদের এই পরামর্শগুলো গ্রাম পঞ্চায়েতের উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরিতে দারুণ কাজে আসবে।

হোল-অফ-গভর্নমেন্ট অ্যাপ্রোচ

দেশজুড়ে এই বিশাল আয়োজনে বিভিন্ন মন্ত্রক ও দপ্তর একসঙ্গে কাজ করেছে। মাঠপর্যায়ের কর্মী এবং 'মাই ভারত' (MY Bharat) স্বেচ্ছাসেবকরাও হাত লাগান। রাজ্য, জেলা, ব্লক এবং গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে তাঁদের এই উদ্যোগের ফলে সরকারি প্রকল্পগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা সহজ হয়েছে। এতে তৃণমূল স্তরে জনভাগীদারি আরও মজবুত হলো।

পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রকের সচিব বিনীত জোশী এবং অন্যান্য শীর্ষ আধিকারিকরা সারাদিন ধরে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। গোটা দেশে গ্রামসভাগুলোর কাজ কেমন চলছে, তা তাঁরা তদারকি করেন।

রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর পঞ্চায়েতি রাজ দপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের যৌথ চেষ্টাতেই এত বড় একটা কর্মসূচি সফলভাবে করা সম্ভব হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ২১টি মন্ত্রক ও দপ্তরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রক এই 'পিপলস প্ল্যান ক্যাম্পেইন' চালাচ্ছে। ২০১৮ সাল থেকেই সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই প্রচার চলছে, যাতে পঞ্চায়েতগুলো সবার মতামত নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা করতে পারে।

মূল উদ্যোগ ও সাফল্য

রাষ্ট্রীয় গ্রাম স্বরাজ অভিযানের আওতায় স্থানীয় উন্নয়নের ৯টি বিষয়ে মন্ত্রক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ২ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি গ্রাম পঞ্চায়েত তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করে ই-গ্রামস্বরাজ (eGramSwaraj) পোর্টালে আপলোড করেছে। পঞ্চায়েত অ্যাডভান্সমেন্ট ইনডেক্সের মাধ্যমে প্রতিটি পঞ্চায়েত নিজেদের সাফল্য ও খামতি বুঝতে পারছে। এর ওপর ভিত্তি করেই গ্রামসভাগুলো 'বিকশিত ভারত'-এর লক্ষ্যে অগ্রাধিকার ঠিক করতে পারে।

আর্থিক ক্ষমতায়ন ও প্রশাসন

ষোড়শ অর্থ কমিশন ২০২৬-৩১ সালের জন্য গ্রামীণ স্থানীয় সংস্থাগুলোকে ৪,৩৫,২৩৬ কোটি টাকা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের তুলনায় এটা প্রায় ৮৪ শতাংশ বেশি। মাথাপিছু বার্ষিক অনুদান ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৯৫০ টাকা হয়েছে। 'সমর্থ' (SAMARTH) পঞ্চায়েত পোর্টালে ৫৭ লাখ করদাতা এবং ১৫ লাখ সম্পত্তির নাম নথিভুক্ত হয়েছে। 'আত্মনির্ভর পঞ্চায়েত বিশেষ পুরস্কার'-এ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ইনসেনটিভ দেওয়া হচ্ছে। পঞ্চায়েতের হিসাবরক্ষণে এখন কেন্দ্র ও রাজ্যের মতো ৬-স্তরের কাঠামো মানা হচ্ছে। আড়াই লাখের বেশি পঞ্চায়েতি রাজ প্রতিষ্ঠান 'অডিটঅনলাইন' (AuditOnline) সিস্টেমে যুক্ত হয়েছে।

জমির অধিকার ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান

'স্বামিত্ব' (SVAMITVA) প্রকল্পের আওতায় ২.০৬ লাখ গ্রামের ৩.৩৩ কোটি প্রপার্টি কার্ড তৈরি হয়েছে। প্রায় ১,৭১৩ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে এবং মহিলাদের সম্পত্তির মালিকানায় উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। ১ জুলাই থেকে চালু হওয়া 'বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)'-এর আওতায় যোগ্য পরিবারগুলোকে বছরে ১২৫ দিনের কাজ দেওয়া হচ্ছে। ফেস অথেনটিকেশনের মাধ্যমে হাজিরা এবং ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবস্থা রয়েছে। এখনও পর্যন্ত ৩১.৬৯ কোটি শ্রম-দিবস তৈরি হয়েছে। ২.২৩ কোটি পরিবারের ২.৮১ কোটির বেশি শ্রমিক কাজ পেয়েছেন। প্রায় ২.৩১ লাখ গ্রাম পঞ্চায়েতে কাজ চলছে। ২০২৬-২৭ সালের জন্য রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোকে অন্তর্বর্তীকালীন ৯৩,৮৪১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। 'বিকশিত গ্রাম পঞ্চায়েত প্ল্যান'-এর মাধ্যমে গ্রামসভাগুলো স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের সিদ্ধান্ত নিতে পারছে।

জল সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা

জল জীবন মিশনের আওতায় গ্রামে কলের জলের সংযোগ ৩.২৩ কোটি (১৭ শতাংশ) থেকে বেড়ে ১৬ কোটির (৮০ শতাংশের বেশি) বেশি পরিবারে পৌঁছেছে। সম্পূর্ণ হওয়া জল সরবরাহ প্রকল্পগুলো পঞ্চায়েত ও স্থানীয়দের হাতে তুলে দিতে 'জল অর্পণ' কর্মসূচির কথাও তুলে ধরা হয়। স্বচ্ছ ভারত মিশন (গ্রামীণ)-এর অধীনে ১২.২২ কোটি শৌচালয় তৈরি হয়েছে। ৫.২৫ লাখের বেশি গ্রাম (৮৯.৬ শতাংশ) নিজেদের 'ওপেন ডেফিকেশন ফ্রি প্লাস (মডেল)' ঘোষণা করেছে। 'স্বচ্ছতা হি সেবা ২০২৬'-এর সমাপ্তি লগ্নে গ্রামসভাগুলোতে 'সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট রুলস, ২০২৬' নিয়েও আলোচনা হয়।

জল সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা

সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে ১.৫৫ কোটির বেশি কৃত্রিম রিচার্জ ও স্টোরেজ স্ট্রাকচার তৈরি হয়েছে। প্রথম পর্যায়ের ইমপ্যাক্ট স্টাডিতে দেখা গেছে, ২.৪৩ বিলিয়ন কিউবিক মিটার ভূগর্ভস্থ জল রিচার্জ হয়েছে। ওয়াটারশেড উন্নয়নের নিয়ম বদলে সমতল এলাকায় হেক্টর প্রতি বরাদ্দ বাড়িয়ে ২২,০০০ টাকা এবং পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় ২৮,০০০ টাকা করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ৭ বছর থেকে কমিয়ে ৫ বছর করা হয়েছে। 'ক্যাচ দ্য রেইন' কর্মসূচির আওতায় বৃষ্টির জল ধরে রাখা এবং ভূগর্ভস্থ জল রিচার্জ নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো হয়। স্থানীয় মানুষ, পঞ্চায়েত প্রতিনিধি এবং জেলা আধিকারিকরা এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সচেতনতামূলক ভিডিও দেখানো, গাছ লাগানো, শ্রমদান এবং 'জল শপথ' নেওয়ার মতো কাজগুলো হয়। বৃষ্টির প্রতিটি বিন্দু বাঁচানোর বার্তা দিতে 'ক্যাচ দ্য রেইন' (CTR) অ্যান্থেমও বাজানো হয়।

খাদ্য সুরক্ষা ও উপভোক্তা সুরক্ষা

'ওয়ান নেশন ওয়ান রেশন কার্ড'-এর মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৩.২৭ কোটি পোর্টেবিলিটি ট্রানজ্যাকশন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনায় ৮১.৩৫ কোটি উপভোক্তাকে বিনামূল্যে রেশন দেওয়া হচ্ছে, যার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ১৭টি ভাষায় চালু থাকা ন্যাশনাল কনজিউমার হেল্পলাইনে ২০২৬ সালের আগস্টে ৩,৪২,৩৭১টি কল এসেছে, যা ২০১৯ সালের আগস্টে ছিল ৭৮,৪৭৭টি। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে এখনও পর্যন্ত ১০৫ কোটি টাকার বেশি রিফান্ড পেতে সাহায্য করেছে এই হেল্পলাইন। ই-জাগৃতি (e-Jagriti) প্ল্যাটফর্মে ২.৮১ লাখ মামলার মধ্যে ২.৫৫ লাখের বেশি নিষ্পত্তি হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মটি 'ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডস ফর ই-গভর্ন্যান্স ২০২৬'-এ রুপোর পদক পেয়েছে।

জমির রেকর্ডের ডিজিটালাইজেশন

ডিজিটাল ইন্ডিয়া ল্যান্ড রেকর্ডস মডার্নাইজেশন প্রোগ্রামের আওতায় ৯৯.৯০ শতাংশ জমির রেকর্ড এবং ৯৭.৪ শতাংশ ম্যাপ ডিজিটাইজ করা হয়েছে। ৩১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মানুষ অনলাইনে জমির রেকর্ড দেখতে পারেন। ২৪টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ডিজিটাল সই করা রেকর্ড ডাউনলোড করা যায়। এর ফলে জালিয়াতি কমছে এবং সহজে ঋণ পাওয়া যাচ্ছে।

সামাজিক সচেতনতায় আন্তঃমন্ত্রক সমন্বয়

গ্রাম স্তরে সচেতনতা বাড়াতে বেশ কয়েকটি মন্ত্রক ও দপ্তর দারুণ সাহায্য করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক নতুন ফৌজদারি আইন— ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা এবং ভারতীয় সাক্ষ্য অধিনিয়ম নিয়ে সচেতনতা বাড়িয়েছে। সমবায় মন্ত্রক সমবায়গুলোর ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে, নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রক 'বাল্যবিবাহ মুক্ত ভারত' নিয়ে এবং সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রক 'নেশামুক্ত ভারত অভিযান' নিয়ে প্রচার চালিয়েছে। লক্ষ্য একটাই— নিরাপদ, সুস্থ, বাল্যবিবাহ-মুক্ত এবং মাদকমুক্ত গ্রাম গড়ে তোলা।

এই বিশেষ গ্রামসভাগুলো প্রমাণ করে দিল যে, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র এবং স্থানীয় প্রশাসনের মূল ভিত্তি হলো গ্রামসভা। পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রক জানিয়েছে, “পিপলস প্ল্যান ক্যাম্পেইনের আওতায় ২০২৭-২৮ সালের জন্য জনমুখী পঞ্চায়েত উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির দিকে আমরা তাকিয়ে আছি। বিকশিত ভারতের বৃহত্তর লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী, আত্মনির্ভর এবং বিকশিত পঞ্চায়েত গড়ে তোলাই আমাদের উদ্দেশ্য।”