রাজস্থানের যোধপুরে 'তরঙ্গ শক্তি-২০২৬' বায়ুসেনা মহড়ায় যোগ দিয়ে আধুনিক যুদ্ধকৌশল নিয়ে মুখ খুললেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। তিনি জানান, আগামী দিনে সেনার শক্তি নির্ভর করবে দ্রুত পরিস্থিতি বোঝা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপর। পাশাপাশি, দেশীয় প্রযুক্তিতে অস্ত্র তৈরির ওপরও জোর দেন তিনি।

রাজস্থানের যোধপুরে শনিবার 'তরঙ্গ শক্তি-২০২৬' (Tarang Shakti-2026) বহুজাতিক বায়ুসেনা মহড়ায় যোগ দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। সেখানে তিনি আধুনিক যুদ্ধকৌশলের পরিবর্তন এবং দেশের মাটিতে অস্ত্র তৈরির গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন। এই মহড়ায় ভারতীয় বায়ুসেনার সারং হেলিকপ্টার ডিসপ্লে টিম আকাশে দারুণ কসরত দেখায়। তাদের নিখুঁত সমন্বয় ছিল চোখে পড়ার মতো। পাশাপাশি, ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি লাইট কমব্যাট এয়ারক্রাফট (LCA) তেজসও আকাশে নিজের শক্তি প্রদর্শন করে। 

দেশের মাটিতে তৈরি এই যুদ্ধবিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারতের ক্রমবর্ধমান স্বনির্ভরতারই প্রমাণ দেয়। মহড়ায় ভারতের নিজস্ব লাইট কমব্যাট হেলিকপ্টার (LCH) 'প্রচণ্ড'-কেও সামনে আনা হয়। আত্মনির্ভর ভারতের এক শক্তিশালী প্রতীক এই হেলিকপ্টার। এটি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি, প্রযুক্তির উন্নতি এবং মহাকাশ গবেষণায় ভারতের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার কথা তুলে ধরে। এমন একটি জটিল বহুজাতিক বায়ুসেনা মহড়া সফলভাবে আয়োজন করার জন্য ভারতীয় বায়ুসেনা সহ যুক্ত থাকা সমস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিনন্দন জানান প্রতিরক্ষামন্ত্রী। 

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, "অংশগ্রহণকারী সব দেশ, তাদের নেতৃত্ব এবং ক্রু সদস্যদের আমি স্বাগত জানাচ্ছি। আপনারা ভারতে এসেছেন, আমাদের সঙ্গে উড়েছেন, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন। আপনাদের উপস্থিতি এই মহড়ার গুরুত্ব অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি আশা করি, আপনারা শুধু ভারতের স্মৃতিই নয়, নতুন পেশাদারি অভিজ্ঞতা এবং আমাদের ক্ষমতা সম্পর্কে একটা গভীর ধারণা নিয়ে ফিরে যাবেন।" 
নতুন প্রযুক্তি আর নতুন ধরনের অস্ত্রের কারণে আধুনিক যুদ্ধ যে ক্রমশ জটিল হচ্ছে, সে কথাও মনে করিয়ে দেন রাজনাথ। তিনি বলেন, "যুদ্ধ এখন আর শুধু জল, স্থল বা আকাশে আটকে নেই। মহাকাশ, সাইবার দুনিয়া, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম এবং তথ্যপ্রযুক্তির জগতেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। আচমকা হামলা আর চরম অনিশ্চয়তা এখন সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রে রাষ্ট্রহীন শক্তিগুলোর (non-state actors) প্রভাবও বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ এবং সমুদ্রপথগুলোকে এখন রীতিমতো হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।" 
ড্রোন এবং চালকহীন সিস্টেমগুলো কীভাবে যুদ্ধের গতি ও ধরন বদলে দিয়েছে, সেটাও তুলে ধরেন তিনি। 
রাজনাথ বলেন, "আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতিটাই বদলে দিচ্ছে। ইলেকট্রনিক যুদ্ধে স্পেকট্রামের ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। দূরপাল্লার নিখুঁত অস্ত্রগুলো যুদ্ধের ময়দানকে অনেকটাই বড় করে দিয়েছে।" 
তাঁর মতে, আগামী দিনে সেনার শক্তি কতগুলো যুদ্ধবিমান বা ট্যাঙ্ক আছে তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং পরিস্থিতি কত দ্রুত বোঝা যাচ্ছে এবং কত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করা যাচ্ছে, সেটাই আসল হবে। গোটা বিশ্বে কী ঘটছে এবং তার প্রভাব কী হতে পারে, ভারত যে সেদিকে প্রতিনিয়ত নজর রাখছে, সেটাও স্পষ্ট করেন তিনি। 
তিনি বলেন, "গতি, নিখুঁত লক্ষ্য, সঠিক তথ্য এবং সমন্বয়— এগুলোই এখন আসল। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। পুরনো বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে, আর নতুন ব্যবস্থা এখনও সেভাবে তৈরি হয়নি। এই অস্থির পরিস্থিতিতে প্রতিটি দায়িত্বশীল দেশেরই সব সময় সতর্ক থাকা উচিত। ভারতও নিজেদের অঞ্চল এবং তার বাইরের পরিস্থিতি ও কৌশলগত প্রভাবের ওপর কড়া নজর রাখছে।" 
রাজনাথ আরও বলেন, "প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শী নেতৃত্বে ভারত অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিল যে, আগামী দিনে জাতীয় নিরাপত্তাকে অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। আমরা এই আসন্ন বিপদগুলো আঁচ করেই নিজেদের সুরক্ষিত করার সিদ্ধান্ত নিই। আমরা আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার একটা কঠিন বাস্তব বুঝেছিলাম— সংকটের সময় কোনও দেশই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে না, যদি না তারা নিজেদের অস্ত্র ও প্রযুক্তি নিজেরাই তৈরি করতে পারে। আর সেই কারণেই আমরা প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে 'আত্মনির্ভরতা'-কে জাতীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছি।" 
আত্মনির্ভর ভারতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি জানান, এর মানে গোটা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। বরং দেশের ভেতরেই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ডিজাইন, তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আপগ্রেড করার ক্ষমতা বাড়ানো। ভারত শুধু নিজেদের প্রয়োজনেই নয়, বরং বিশ্বের নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা সাপ্লাই চেইনে অবদান রাখার লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে।
তেজস যুদ্ধবিমান, ধ্রুব, রুদ্র, প্রচণ্ড থেকে শুরু করে LUH-এর মতো হেলিকপ্টার তৈরির ক্ষমতা, আকাশ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, AESA রাডার, ইলেকট্রনিক সিস্টেম এবং চালকহীন প্রযুক্তির উন্নতি— এই সবকিছুই ভারতের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার প্রমাণ দেয় বলে জানান তিনি। 
তাঁর কথায়, "ভবিষ্যতের দিকে তাকালে, আমাদের অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট (AMCA) প্রোগ্রাম ভারতকে পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ফাইটার প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলবে। আমরা এখন উন্নত অ্যারো-ইঞ্জিন তৈরি এবং যৌথ উৎপাদনের দিকেও জোর দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু যন্ত্রপাতি তৈরি করা নয়, বরং নতুন ডিজাইন করা, উদ্ভাবন করা এবং তা সরবরাহ করা।" 
রাজনাথ আরও বলেন, "আমরা জানি যে কোনও দেশই একা চলতে পারে না। গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, মজবুত সাপ্লাই চেইন এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদারিত্ব এখন জাতীয় শক্তির অন্যতম প্রধান উপাদান। তাই ভারতের জন্য নিজস্ব ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্বস্ত সঙ্গীদের সঙ্গে সহযোগিতা করাটাও সমান জরুরি। দরকার পড়লে আমাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা থাকতে হবে, আবার স্বার্থ ও দায়িত্ব মিলে গেলে অন্যদের সঙ্গেও কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে।"
'তরঙ্গ শক্তি-২০২৬' মহড়া নিয়ে তিনি বলেন, "এই মহড়া হয়তো আজ শেষ হচ্ছে, কিন্তু এর থেকে পাওয়া শিক্ষা যেন আজই শেষ না হয়। আমাদের প্রশিক্ষণ, কৌশল, প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যতের ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই শিক্ষাকে কাজে লাগাতে হবে।"