৩৬ বছর আগে বন্দুকের গুলিতে ঝাঁজরা হতে হয়েছিল ইন্দিরাকে। গত লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে সর্বভারতীয় ও সর্বপ্রাচীন যে রাজনৈতিক দলটিকে খুঁজে পেতে বায়নাকুলারের দরকার পড়ছে , সেই দলটিতে পরিবার তন্ত্র ও হাইকম্যান্ড নির্ভরশীলতার জন্ম দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। নেহরুর জমানায় যে দলটি চলত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, ইন্দিরা গান্ধী সেই কংগ্রেস দলে হয়ে ওঠেন একনায়িকা। কংগ্রেস দলের ক্ষমতাকে তিনি যেমন সম্পূর্ণ নিজের হাতের মুঠোয় রাখতেন তেমনই যত্নের সঙ্গে পালন করতেন পরিবারতন্ত্রকে। যে কারণে ছোট ছেলে সঞ্জয়কে নিজের উত্তরসূরি ঠিক করে ফেলেছিলেন। কিন্তু বিমান দুর্ঘটনায় সঞ্জয়ের আকস্মিক মৃত্যু হলে ইন্দিরার সেই ইচ্ছা সফল হয়নি। তারপরও তাঁর পরিবারবাদ-প্রকল্প থেমে থাকেনি। তিনি বড় ছেলে রাজীবকে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিবারবাদ ও হাইকম্যান্ড নির্ভরশীলতাই দেশের সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দলটির ক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ইন্দিরা এবং রাজীব গান্ধীর মর্মান্তিক হত্যাকান্ড দেশের সর্বপ্রাচীন দলটিকে এমন ধাক্কা মারে যে দলের শিরদাঁড়াটাই ভেঙে যায়। যে ভাঙনের শুরু হয়েছিল লালবাহাদুর শাস্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর পরে। কংগ্রেসের সিন্ডিকেট ইন্দিরা গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী করেছিল একরকম ভাবনা নিয়ে। আর ইন্দিরা ক্ষমতা পাওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই দল ভেঙে আলাদা দল গড়ে কংগ্রেসের প্রবীণদের প্রাধান্যকে খর্ব করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কংগ্রেস এক কেন্দ্রীভূত গোষ্ঠী যেখানে তিনিই দলের সর্বেসর্বা। কিন্তু তাঁর এই ক্ষমতায়ন ও পরিবারতন্ত্রের যাঁতাকলে ক্ষয় হয় কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি। আর ইন্দিরার একনায়িকাতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চায় কংগ্রেস দলটি স্রেফ একটি তাঁবেদারদের গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ইন্দিরার পুত্রবধূ সোনিয়াও সেই পরিবারবাদকেই টিকিয়ে রাখতে কংগ্রেস দলটিকে আরও বেশি হাইকম্যান্ড নির্ভরশীলই করে চলেছেন।

একসময় এ দেশে রাজনীতি চর্চায় নেহরু ও ইন্দিরা ছাড়া আর কোনও নামই প্রায় উচ্চারিত হত না। কিন্তু আজ আর তাদের নাম বিশেষ কেউ বলেন না। বোধহয় রাজনীতির ইতিহাস এভাবেই উত্তর দেয়। প্রসঙ্গত, বেশ কয়েকটি রাজ্য কেন্দ্রীয় সরকার থেকে স্বাধীনতা দাবি করতে শুরু করে ইন্দিরার ৪র্থ দফার প্রধানমন্ত্রীত্বে। যার মধ্যে অন্যতম ছিল পঞ্জাব। সন্ত জার্নাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের নেতৃত্বে স্বতন্ত্র ভূখন্ড ‘খালিস্তান’ এর দাবিতে শিখরা আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮২-র জুলাই মাসে জার্নাইল সিং অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে অবস্থান নেন এবং শিখ বিদ্রোহকে আন্দোলিত করেন। ১৯৮৪ সালের জুন মাসে ইন্দিরা শিখ বিদ্রোহ দমন করতে স্বর্ণমন্দিরে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে অপারেশন ব্লু-স্টার পরিচালনা করেন। ভারতীয় সেনাদের হিসাব অনুযায়ী ৪৯৩ জন শিখ বিদ্রোহী এবং সেনাবাহিনীর ৪ অফিসারসহ ৮৩ জন নিহত হন। অপারেশন ব্লু-স্টার চলেছিল ৬ জুন পর্যন্ত, যেদিন স্বর্ণমন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা অর্জন দেবের মৃত্যুবার্ষিকী। সেদিন প্রচুর শিখ তীর্থযাত্রী আসে স্বর্ণমন্দিরে। তার মানে যত বেশি সংখ্যক শিখ হত্যা করে বিদ্রোহ দমন করাই আসল লক্ষ্য। পরবর্তী সময়ে পাঞ্জাবের গ্রামাঞ্চলকে বিচ্ছিন্নতাবাদমুক্ত করতে ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনী নামানো হয়।

আরও পড়ুন: 'দুনিয়ার সবচেয়ে কুৎসিত নারী ভারতীয়রা', এই মার্কিন প্রেসিডেন্টের বর্ণবাদী মন্তব্য ঘিরে উঠল ঝড়

পবিত্র স্বর্ণমন্দিরের অবমাননা আর খালিস্তানের স্বপ্ন ভেঙে দেওয়ার প্রতিশোধ নিতে ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪, সাৎওয়ান্ত সিং ও বেয়ান্ত সিং নামে নিজের দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ইন্দিরা। ইন্দিরা সেদিন কালো পাড়ের গেরুয়া রঙের শাড়ি পড়ে ব্রিটিশ অভিনেতা ও পরিচালক পিটার আস্তিনভের আইরিশ টেলিভিশনের জন্য একটি ডকুমেন্টারি ফিল্মের জন্য সাক্ষাৎকার দিতে ব্যস্ত ছিলেন। ১ নং সফদরজং রোডের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে হেঁটে পাশের আকবর রোডের অফিসে যাচ্ছিলেন তিনি। বেশ রোদ ঝলমলে দিন তবু রোদ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে আড়াল করতে সেপাই নারায়ণ সিং একটা কালো ছাতা নিয়ে পাশে পাশে হাঁটছিলেন। কয়েক পা পেছনেই ছিলেন ব্যক্তিগত সচিব আর কে ধাওয়ান, তার পেছনে ছিলেন ব্যক্তিগত পরিচারক নাথু রাম। সবশেষে ছিলেন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা  অফিসার, সাব ইন্সপেক্টর রামেশ্বর দয়াল। হঠাৎ পাশে দাঁড়ানো নিরাপত্তাকর্মী বিয়ন্ত সিং রিভলবার বার করে ইন্দিরা গান্ধীর দিকে গুলি চালায়। শিখ দেহরক্ষী ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করার পর দেশজুড়ে দাঙ্গা বাধে।

আরও পড়ুন: জরুরী অবস্থার ছয় খলনায়ক, যারা শাস্তির বদলে পেয়েছিল পুরস্কার, চিনে নিন ছবিতে ছবিতে

আটহাজারের মত লোক নিহত হয়। দিল্লিতেই নিহত হয় তিন হাজার। দাঙ্গা চলে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত। সিবিআই-এর মতে দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু কমকর্তার সহায়তায় এই দাঙ্গা চলে। মায়ের মৃত্যুর পর রাজিব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই বলেছিলেন বড় গাছ যখন পড়ে, তখন মাটি কাঁপে। দেশে জরুরি অবস্থার সময়ে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনরত হাজার হাজার শিখকে আটক করে কারাগারে রাখা হলে শিখরা মাঝে মধ্যেই হামলা চালালে সরকার বলত সন্ত্রাসবাদী। ইন্দিরা হত্যার পর সরকারি রিপোর্ট অনুসারে, দু’হাজার ৭০০ জন শিখ নিহত হয়। দিল্লি থেকে ২০ হাজার শিখ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ভারত সরকারকে জানায়, এখনো এই ‘মাস কিলিং’-এর বিচার হয়নি। ২০১১ সালে উইকিলিকস ক্যাবল লিকস জানায়, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস সরকার ওই হত্যাকাণ্ডে মদত জুগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ওই কাজকে ভারত সরকারের শিখবিরোধী ‘অপরচুনিজম’ ও ‘হ্যাট্রিড’ নামে অভিহিত করে।