মৃত্যুসজ্জায় পৌঁছলে, তবেই মিলবে ডাক্তার। গত সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে চিনের উপকূলে আটকে থাকা দুটি জাহাজের অন্তত ৪১ জন ভারতীয় নাবিককে এরকমটাই বলেছে চিনা কর্তৃপক্ষ বলে অভিযোগ। চিনের বোহাই সমুদ্রের উপকূলে এই জাহাজ দুটিতে করে অস্ট্রেলিয়া থেকে রান্নার কয়লা আনান হয়েছিল চিনে। কিন্তু দুই দেশের মধ্য়ে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে, চিন সরকার অস্ট্রেলিয়া আচমকা কয়লা আমদানী নিষিদ্ধ করে দেয়। এদিকে মাল খালাস না করে জাহাজগুলি ফিরতে গেলে চিনা নৌসেনা তাদের আটক করবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে।

যে দুটি জাহাজ আটকা পড়েছে, তাদের একটি হল সুইস-ইতালিয়ান 'এমভি আনাস্তাসিয়া'। তাতে ভারতীয় আছেন ১৬ জন। অপরটি ভারতীয় বাল্ক কেরিয়ার 'জগ আনন্দ'। জগ আনন্দে ভারতীয় নাবিক রয়েছেন ২৫ জন। দুটি জাহাজই  বর্তমানে, চিনের জিনতাং বন্দর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে, বোহাই সাগরের ক্যাফিডিয়ান অ্যাঙ্করেজ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছে। এই আটকে পড়া নাবিকদের ফিরিয়ে আনতে ভারত সরকার ইতিংমধ্যেই জিনপিং সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছে, তবে চিনের দিক থেকে উদাসীনতা ছাড়া কিছু মেলেনি।

'সানডে গার্ডিয়ান' পত্রিকাকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে এমভি আনাস্তাসিয়ার অন্যতম ক্রু সদস্য, গৌরব সিং জানিয়েছেন, সাত মাস ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁরা মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। অনেককেই হতাশা গ্রাস করছে, একজন ক্রু সদস্যও আত্মহত্যা করারও চেষ্টা করেছেন। বাড়িতে তাঁদের পরিবারও চিন্তিত। পুনের বাসিন্দা গৌরব সিং-এর চলতি বছরের নভেম্বরেই বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু, চিনের তুঘলকি সিদ্ধান্তে তাও বাতিল করতে হয়েছে।

বিয়ে তো দূর, আদৌ আর কোনওদিন বাড়ি ফিরতে পারবেন কিনা, এখন সেই চিন্তাই কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে গৌরব সিংদের। তিনি অভিযোগ করেছেন, এমনিই দীর্ঘদিন ধরে দলের উপর থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন ক্রু সদস্যরা, তার উপর চিনা কর্তৃপক্ষ 'দূষিত' পানীয় জল সরবরাহ করায় অনেকেরই ত্বকের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তবে চিকিত্সার কোনও ব্যবস্থা চিন করছে না। সাফ জানানো হয়েছে, মৃত্যুসজ্জায় কেউ না যাওয়া পর্যন্ত কোনও ডাক্তার মিলবে না। গৌরব সিং-এর আরও দাবি, তাঁদের ২টি জাহাজ ছাড়াও বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কমপক্ষে আরও অন্তত ৬০টি জাহাজ চিন উপকূলে আটকে আছে। প্রত্যেকটিই অস্ট্রেলিয়া থেকে পণ্য বহন করে এনেছিল। সেইসব জাহাজেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভারতীয় নাবিক রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। মাঝ সমুদ্রে তাদের ইন্টারনেট সংযোগ নেই বলে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগও করা যাচ্ছে না।

ভারতের ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ সিফেরার্স বা এনএসআইআই অবশ্য সানডে গার্ডিয়ান-কে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রক এবং বিদেশ মন্ত্রকের সহযোগিতায়, এই অচলাবস্থার সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। তারা জানিয়েছে, কোভিড-১৯'এর সমস্যাকে ঠাল করে ভারতীয় ক্রু সদস্যদের চিনের মাটিতে পা রাখতে দিচ্ছে না বেজিং। তবে, শিপিং সংস্থাগুলি ক্রু সদস্যদের নিয়মিত খাবার ও জল সরবরাহ করছে এবং ক্রু সদস্যদের যথাযথ যত্ন নিচ্ছে বলেই দাবি করেছে তারা। ক্রু সদস্যদের মনোবল বাড়াতে তাঁদের মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।