ইরানের ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা তাদের প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের জন্য যে বিশাল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করছে, তার ব্যাপ্তি, আকার ও গুরুত্বের সঙ্গে ইতিহাসে খুব কম ঘটনারই তুলনা চলে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলায় তিনি নিহত হয়েছিলেন।

ইরানের ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা তাদের প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের জন্য যে বিশাল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করছে, তার ব্যাপ্তি, আকার ও গুরুত্বের সঙ্গে ইতিহাসে খুব কম ঘটনারই তুলনা চলে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলায় তিনি নিহত হয়েছিলেন। ইরান ও ইরাকের অন্তত পাঁচটি শহরে আয়োজিত এই বিশাল অনুষ্ঠানের জন্য খামেনেইর মরদেহ তেহরানে এসে পৌঁছেছে; শুক্রবার থেকেই এই আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে। শনিবারের এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম হবে, যার মধ্যে থাকবেন বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের একটি দলও।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

ইরানি গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, শোকাতুর মানুষ ইরানের ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকায় মোড়ানো খামেনেইয়ের কফিনটি বহন করে 'গ্র্যান্ড মোসাল্লা'-র ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন। এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির অন্যতম প্রধান আনুষ্ঠানিক স্থান। অন্য ছবিতে দেখা যায়, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া-পূর্ববর্তী এক অনুষ্ঠানে কালো পোশাক পরিহিত জনতা; সেখানে লাল ফুল ও বাতাসে ঝুলে থাকা সাদা প্রজাপতির পটভূমিতে কফিনটি রাখা হয়েছে।

সেই বিশাল আয়োজন

যুদ্ধের তীব্রতার কারণে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রস্তুতি শুরুতে কিছুটা বিলম্বিত হলেও এখন তেহরানে তা পুরোদমে চলছে। এছাড়া আগামী সপ্তাহে কোম ও মাশহাদে বিশাল শোভাযাত্রা এবং ইরাকেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তির পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যখন এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পালন করছে, ঠিক তখনই এই আনুষ্ঠানিকতাগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

অনেক শিয়া মুসলমানের কাছে আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে শ্রদ্ধেয় খামেনেই ৮৬ বছর বয়সে ইরানের রাজধানীর কেন্দ্রে অবস্থিত তাঁর বাসভবন ও কার্যালয় চত্বরে হামলায় নিহত হন। বিশাল আয়তনের 'গ্র্যান্ড মোসাল্লা'-য় তিন দিন ধরে তাঁর মরদেহ রাখা হবে; এই স্থানটি খামেনেইর ছবি ও বাণী সম্বলিত ব্যানারে সুসজ্জিত করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে তাঁর নিহত আত্মীয়দের মরদেহও রাখা হবে, যার ফলে এটি দেশটির ইতিহাসে বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় পরিণত হতে যাচ্ছে। তেহরানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে খামেনেইর মরদেহ ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় নিয়ে যাওয়া হবে; এরপর ৯ জুলাই ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে—যেখানে তাঁর জন্ম—ইমাম রেজার মাজারে তাঁকে সমাহিত করা হবে।

গণভোট

তবে খামেনেইর মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর আয়োজিত এই শেষকৃত্যের জটিলতা ও ব্যাপকতার চেয়েও হয়তো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হল বর্তমান পরিস্থিতিতে এর প্রতীকী গুরুত্ব। ইরানের ক্ষমতাসীন ধর্মীয় নেতারা বিষয়টিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনগণের আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ এবং এর বিপ্লবী উদ্দীপনা যে এখনো অটুট রয়েছে, তার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। নিজেদের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার শক্তি প্রদর্শনের লক্ষ্যে ইরান সরকার ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি সমর্থককে দেশের বিভিন্ন শহরে সমবেত করার পরিকল্পনা করছে। এ জন্য তারা পরিবহন, আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থাও করছে।

শেষকৃত্যে কেন বিলম্ব

ইসলামি রীতি-নীতি অনুযায়ী অত্যন্ত অস্বাভাবিক এক দীর্ঘ সময়—অর্থাৎ মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর—খামেনেইয়ের জানাজা সম্পন্ন হচ্ছে। তাঁর মৃত্যুর পর ইরান যে চরম ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এই বিলম্ব তারই ইঙ্গিতবহ। কারণ সেই সময়টিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের পক্ষ থেকে টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ চলছিল। এমন গুঞ্জন ছিল যে তাঁর মরদেহ সাময়িকভাবে কোথাও দাফন করে রাখা হয়েছিল, তবে ইরানি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অত্যন্ত অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণেই এই বিলম্ব ঘটেছে। তাঁরা আরও জানান, ধর্মীয় নিয়মকানুন মেনেই খামেনেইয়ের মরদেহ সংরক্ষণ করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, ইসলাম সাধারণত রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় মরদেহ সংরক্ষণের (এমবামিং) বিষয়টি নিরুৎসাহিত করে।

সন্ত্রাসবাদ-দমন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. মহম্মদ ওমর ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, খামেনেইয়ের মরদেহ নিশ্চিতভাবেই হিমাগারে বা কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় নয়। কারণ ইসলাম রাসায়নিক সংরক্ষণের অনুমতি দেয় না। তিনি বলেন, "শিয়া আইন অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে দাফনে বিলম্ব এবং হিমাগারে মরদেহ সংরক্ষণের অনুমতি রয়েছে। তাছাড়া সর্বোচ্চ নেতার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধানের বিশেষ ছাড় পাওয়াও সহজ।" তিনি আরও যোগ করেন, "ইরানের ফরেন্সিক মর্গে এমনিতেই মাসের পর মাস মরদেহ রাখা হয়, তাই হিমাগারে চার মাস মরদেহ রাখাটা কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। ধর্মীয় ও আইনি মানদণ্ড বলতে মূলত এসব বিষয়কেই বোঝানো হয়।"