চিনে চালু হওয়া নতুন 'এথনিক ইউনিটি' আইনের আসল উদ্দেশ্য হল হান চিনা সংস্কৃতির অধীনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দমন করা। এই আইন উইঘুর, তিব্বতিদের মতো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে এবং দেশের বাইরে থাকা সমালোচকদেরও আইন দেখিয়ে চুপ করানোর ক্ষমতা দিচ্ছে বেজিংকে।
চিনে একটা নতুন আইন চালু হয়েছে, যার নাম ‘এথনিক ইউনিটি’। সোজা কথায়, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হান চিনা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি মেনে সবাইকে চলতে হবে। অন্য কোনও সংস্কৃতির আর জায়গা নেই, আইনত ভাবেই নেই। আর ব্যাপারটা শুধু এখানেই শেষ নয়। এই আইন শুধু চিনের বাসিন্দাদের জন্যই নয়, দেশের বাইরে থাকা নাগরিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। সরকারের বিরুদ্ধে কোনও কথা বলা চলবে না। বেজিং বরাবরই সমালোচকদের দমন করে এসেছে, এমনকি দেশের বাইরের ভিন্নমতাবলম্বীদেরও চুপ করানোর চেষ্টা করেছে। এখন এই নতুন আইনের মাধ্যমে সেই কাজকেই আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে সতর্ক করেছে।

এক দেশ, এক পরিচিতি
বেজিং এই নতুন আইনকে ‘সামাজিক ঐক্য’ এবং ‘একক জাতীয় পরিচয়’ তৈরির পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। তাদের দাবি, দেশের ৫৬টি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক আরও মজবুত করাই এর লক্ষ্য। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এর আসল উদ্দেশ্য হল জাতিগত, সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত স্বাধীনতার অবসান ঘটানো।
হান সংস্কৃতি
চিনের ১.৪ বিলিয়ন জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশই হান চিনা। সমালোচকদের মতে, এই আইনের অর্থ হল সবাইকে হান সংস্কৃতি অনুসরণ করতে হবে। এর ফলে উইঘুর, মঙ্গোলিয়ান এবং তিব্বতিদের মতো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার খর্ব হবে। ইতিমধ্যেই মান্দারিন ভাষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যা অন্যান্য ভাষার বৈচিত্র্যকে নষ্ট করবে। এই ‘সাইনিসাইজেশন’ (Sinicisation) বা চিনা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া ২০০০-এর দশক থেকেই শুরু হয়েছিল। শি জিনপিং-এর আহ্বান, "ডালিমের দানার মতো একসঙ্গে লেগে থাকো"।

স্বাধীনতা হারাচ্ছে তিব্বত
চিনের নিয়ন্ত্রণে থাকা তিব্বতে স্বাধীনতা এখন বেজিং-এর মর্জির ওপর নির্ভরশীল। বৌদ্ধমঠগুলো বেজিং-এর নিয়ন্ত্রণে। সেখানে দলাই লামার উপাসনা করার অনুমতি নেই। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ভয়ে ভয়ে দিন কাটান। বিবিসির একটি দলকে তাঁরা জানিয়েছেন, বেজিং-এর বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় লাগে। শিশুদের সরকারি স্কুলে পড়তে হয়, যেখানে শিক্ষার মাধ্যম মান্দারিন এবং শেখানো হয় চিনা সংস্কৃতি। ফলে নতুন প্রজন্ম তিব্বতি ভাষা, বিশ্বাস বা সংস্কৃতি না জেনেই বড় হচ্ছে।
মঙ্গোলিয়া
চিনে বসবাসকারী মঙ্গোলিয়ানদের শিশুদেরও মঙ্গোলিয়ান ভাষার পরিবর্তে মান্দারিন শেখানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলেও, তা দ্রুতই থেমে যায়। তারপর থেকে আর কোনও মিছিল বা বিক্ষোভ হয়নি।
উইঘুর
‘সাইনিসাইজেশন’-এর অংশ হিসেবে ইসলাম ধর্মাবলম্বী উইঘুরদের ‘পুনরায় শিক্ষিত’ করার নামে ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছে। জিনজিয়াং প্রদেশে প্রায় ১০ লক্ষ উইঘুরকে এভাবে আটকে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছে। এখন এই নতুন আইন সেইসব পদক্ষেপকে আইনি সুরক্ষা দেবে।

‘উধাও’ হয়ে যাচ্ছেন মানুষ
এই আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল, এখন থেকে সমালোচক বা ভিন্নমতাবলম্বীদের ধরতে দেশের সীমান্তও আর বাধা হবে না। এই প্রক্রিয়া অবশ্য আগেই শুরু হয়েছে। যেমন, ব্রিটেনে পাঠরতা এক চিনা ছাত্রী চিনের তিব্বতি অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে ভ্রমণের সময় নিখোঁজ হয়ে যান। ঝ্যাং নামের ওই ছাত্রী হান চিনা হলেও তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করতেন। ইউরোপে পড়াশোনার সময় তিনি তিব্বতিদের সমর্থনে লিখতেন। গত বছর চিনের সিচুয়ান প্রদেশের তিব্বতি গ্রামগুলিতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন যে সেখানকার সংস্কৃতিও মুছে ফেলা হচ্ছে। এই নিয়ে কথা বলতে শুরু করার পরেই তিনি নিখোঁজ হন। খবর অনুযায়ী, তিনি এখন নিজের শহরের জেলে বন্দি। তাঁর বিরুদ্ধে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদে’ উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং ১৫ বছরের সাজা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সতর্কতা
২০০৮ সালের তিব্বত এবং জিনজিয়াং-এর বিক্ষোভের কথা কেউ ভোলেনি। ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শি জিনপিং এই ধরনের একীকরণের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁর স্বপ্ন হল এক জাতীয় পরিচয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী দেশ তৈরি করা। এই নতুন আইন সেই লক্ষ্যেরই চূড়ান্ত ধাপ। বেজিং একে ‘অপরিহার্য’ বলে ব্যাখ্যা করলেও ইউরোপ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা সদস্য দেশগুলিকে চিনের সঙ্গে অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি বাতিল করার কথা ভাবতে চিঠি লিখেছেন।

চিনের গোপন পুলিশ
প্রমাণ মিলেছে যে বিশ্বের ৫৩টি দেশে চিনের ১০০টিরও বেশি গোপন পুলিশ স্টেশন রয়েছে। নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের চায়নাটাউনে চিনের জননিরাপত্তা মন্ত্রকের জন্য একটি গোপন পুলিশ স্টেশন চালানো হচ্ছিল। এর প্রধান, যিনি একজন আমেরিকান নাগরিক, তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি অপরাধ স্বীকারও করেন।
এই বছরেই ফ্রান্সেও এই ধরনের পুলিশ স্টেশন খুঁজে পাওয়া গেছে এবং ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে লন্ডনে হংকং-এর নাগরিকদের ওপর নজরদারির জন্য নিযুক্ত দুই চিনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। যদিও চিনা সরকারের দাবি, এগুলো শুধুমাত্র চিনা নাগরিকদের সাধারণ পরিষেবা দেওয়ার কেন্দ্র।
নিউ ইয়র্কের গভর্নরের অফিসের সহকারী লিন্ডা সান ২০২৪ সালে চিনা সরকারের হয়ে কাজ করার জন্য গ্রেপ্তার হন। এর বিনিময়ে তিনি উপহারও নিতেন। আমেরিকার গোয়েন্দারা আরও খুঁজে বের করেছেন যে, চিনের নিরাপত্তা মন্ত্রকের ৩৪ জন অফিসার ভুয়ো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে আমেরিকায় থাকা চিনা ভিন্নমতাবলম্বীদের হুমকি দিচ্ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগও আনা হয়েছে।
সরকারই যখন শিকারি
তবে চিন এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে। নতুন আইনটি এই ধরনের অনেক কার্যকলাপকে আইনি সুরক্ষা দিচ্ছে। চিনের দাবি, এতে জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী হবে এবং নাগরিকদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ৫৬টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্যের কথা বললেও এর আসল উদ্দেশ্য হল বৈচিত্র্যকে মুছে ফেলা। সব সরকারই তথ্য সংগ্রহ করে, কিন্তু চিন কয়েক ধাপ এগিয়ে। রিপোর্ট অনুযায়ী, তারা এমন এক AI টুল তৈরির চেষ্টা করছে যা নাগরিকদের ভবিষ্যৎ কথা ও কাজ আগে থেকেই অনুমান করতে পারবে।


