Antarctica: আন্টার্কটিকা মানেই ধু ধু বরফ, মাইনাস ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রা আর পেঙ্গুইনের রাজত্ব। সেখানে ডাইনোসর? শুনলে রূপকথা মনে হবে। কিন্তু রূপকথাই সত্যি হল। আর্জেন্টিনার একদল বিজ্ঞানী নিশ্চিত করেছেন, ৪০ বছর আগে আন্টার্কটিক উপদ্বীপের ভেগা দ্বীপ থেকে পাওয়া একটা পায়ের হাড় আসলে হ্যাড্রোসর প্রজাতির ডাইনোসরের।
Dinosaurs: সালটা ১৯৮৬। আর্জেন্টিনার বিজ্ঞানী এডুয়ার্ডো অলিভেরো আন্টার্কটিকার ভেগা দ্বীপে খনকার্য চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ পাথরের স্তরে মেলে একটা অদ্ভুত হাড়ের টুকরো। দেখে মনে হয় কোনও বড় প্রাণীর পায়ের অংশ। তখন প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না, আর আন্টার্কটিকায় ডাইনোসর থাকতে পারে, এটা ভাবাই ছিল কষ্টকর। তাই হাড়টিকে ‘অজ্ঞাত সরীসৃপ’ লেবেল দিয়ে তুলে রাখা হয় লা প্লাটা মিউজিয়ামের ড্রয়ারে। কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি, ওই অবহেলার ধুলো জমা হাড়টাই ৪০ বছর পর পাল্টে দেবে ইতিহাস। ২০২৩ সালে লা প্লাটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালিওন্টোলজিস্ট ড. পেনেলোপে ক্রুজাডো ক্যাবালেরো পুরনো কালেকশন ঘাঁটতে গিয়ে হাড়টিকে নতুন করে পরীক্ষা করেন। মাইক্রো-CT স্ক্যান আর আধুনিক তুলনামূলক অ্যানাটমি দিয়ে তিনি চমকে ওঠেন। এটি কোনো সামুদ্রিক সরীসৃপ নয়, এটি একটি হ্যাড্রোসরিড ডাইনোসরের ডান পায়ের মেটাটারসাল হাড়। হ্যাড্রোসরদের ‘ডাক-বিলড ডাইনোসর’ বলা হয়, কারণ এদের মুখটা হাঁসের ঠোঁটের মতো চ্যাপ্টা। এরা ছিল তৃণভোজী, দল বেঁধে থাকত আর দু পায়ে বা চার পায়ে হাঁটতে পারত। ৬৯ মিলিয়ন বছর আগে, যখন টি-রেক্স উত্তর আমেরিকা কাঁপাচ্ছে, তখন তারই দূর সম্পর্কের এই নিরীহ তৃণভোজী আত্মীয়রা ঘুরে বেড়াচ্ছে আন্টার্কটিকার জঙ্গলে।

কিন্তু বরফের আন্টার্কটিকায় জঙ্গল এল কোথা থেকে?
এখানেই আসল টুইস্ট। ১০০ মিলিয়ন বছর আগে আন্টার্কটিকা আজকের মতো দক্ষিণ মেরুতে ছিল না। এটি ছিল গন্ডোয়ানা মহাদেশের অংশ, আর জুড়ে ছিল অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকার সঙ্গে। তখন আন্টার্কটিকার আবহাওয়া ছিল নাতিশীতোষ্ণ, অনেকটা আজকের নিউজিল্যান্ডের মতো। ঘন কনিফার আর ফার্নের জঙ্গল, নদী, হ্রদ, সবই ছিল। গড় তাপমাত্রা ছিল ১০-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই সবুজ আন্টার্কটিকাই ছিল ডাইনোসরদের স্বর্গ। মহাদেশীয় প্লেট সরে যাওয়ার পর আন্টার্কটিকা ধীরে ধীরে দক্ষিণ মেরুতে চলে যায় আর বরফে ঢেকে যায় প্রায় ৩৪ মিলিয়ন বছর আগে।
যুগান্তকারী আবিষ্কার
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব বিশাল। এর আগে আন্টার্কটিকায় থেরোপড বা অ্যানকিলোসরের টুকরো টুকরো ফসিল মিললেও হ্যাড্রোসরের নিশ্চিত প্রমাণ এই প্রথম। তাও আবার ক্রিটেশিয়াস যুগের একদম শেষ দিকে। এর মানে, ডাইনোসর বিলুপ্ত হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত, মানে ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে গ্রহাণুর আঘাতের আগেও, আন্টার্কটিকায় ডাইনোসররা দিব্যি বেঁচে ছিল। ড. ক্যাবালেরো বলছেন, “এই হাড়টা প্রমাণ করল, আন্টার্কটিকা কোনো প্রাণহীন প্রান্তর ছিল না। এটি ছিল ডাইনোসরদের বিচরণক্ষেত্র আর সম্ভবত দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে তাদের যাতায়াতের করিডোর।” ভাবুন একবার, আজ যেখানে মাইনাস ৮০ ডিগ্রি তাপমাত্রা আর বছরে ৬ মাস অন্ধকার, সেখানে একসময় হ্যাড্রোসরের পাল ঘুরে বেড়াত, গাছের পাতা খেত, নদীর ধারে জল খেত। হয়তো শীতকালে অন্ধকার নামলে তারা পরিযায়ী পাখির মতো অন্যত্র চলে যেত, আবার গ্রীষ্মে ফিরে আসত। এই হাড় সেই হারিয়ে যাওয়া সবুজ পৃথিবীর এক টুকরো চিঠি। বিজ্ঞানীরা এখন ভেগা দ্বীপে নতুন করে খননের পরিকল্পনা করছেন। তাদের ধারণা, বরফের নিচে আরও সম্পূর্ণ কঙ্কাল লুকিয়ে আছে। হয়তো কোনোদিন আস্ত একটা হ্যাড্রোসর বা টি-রেক্সের আন্টার্কটিক ভার্সন বেরিয়ে আসবে। ৪০ বছর ড্রয়ারে পড়ে থেকে যে হাড় ইতিহাস বদলে দিল, তার পেটে আরও কত রহস্য লুকিয়ে আছে কে জানে।
আরও খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।


