আমেরিকার প্রাক্তন কর্তা ড্যানিয়েল বেনাইমের মতে, মার্কিন-ইজরায়েল যৌথ হামলার পর তেহরান কী প্রতিক্রিয়া দেবে, তা বুঝতে ডোনাল্ড ট্রাম্প পুরোপুরি ভুল করেছিলেন। তিনি ইরানের মানসিকতা বুঝতে পারেননি এবং এই সংঘাতের জন্য মার্কিন কূটনীতিকরা প্রস্তুত ছিলেন না।
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত আজ ২১ দিনে পড়ল। এর মধ্যেই আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন বাইডেন আমলের এক শীর্ষ কর্তা ড্যানিয়েল বেনাইম। তাঁর মতে, মার্কিন-ইজরায়েল হামলার পর ইরান কী প্রতিক্রিয়া দেবে, তা নিয়ে ট্রাম্পের "হিসেব ভুল ছিল"। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প ভেবেছিলেন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ভেনেজুয়েলার মতো ইরানও নতিস্বীকার করবে, কিন্তু এখানেই তিনি তেহরানের মানসিকতা বুঝতে ভুল করেন।
ট্রাম্পের হিসেবে ভুল ছিল: প্রাক্তন কর্তা
আরব উপদ্বীপ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বেনাইম ANI-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়ার জন্য মার্কিন কূটনীতিকরা "প্রস্তুত ছিলেন না"। ট্রাম্প কি ইরানের প্রতিক্রিয়া বুঝতে ভুল করেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, "আমার মনে হয় তিনি ভুল হিসেব করেছিলেন। কারণ, সবাই জানত যে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু তার জন্য যতটা প্রস্তুত থাকা উচিত ছিল, তারা ততটা ছিল না। যেমন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হাতের কাছে রাখা, বা উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে আনার মতো বিষয়গুলো, যা বিদেশে থাকা নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য যে কোনও দেশের কূটনীতিকদের প্রাথমিক দায়িত্ব। এই কাজগুলো করতেই বেশ কয়েকদিন সময় লেগে যায়।"
'হঠাৎ আক্রমণে অবাক মার্কিন কূটনীতিকরা'
বেনাইমের মতে, হামলার পর ইরান যে রণকৌশল নেয়, তা দেখে মার্কিন কর্মকর্তারা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি যোগ করেন, "ইরানের ওপর আচমকা হামলার পর আমাদের কূটনীতিকরা হতবাক হয়ে যান। ইরান প্রথম থেকেই সংঘাতকে আরও বড় আকার দেওয়ার চেষ্টা করে, যা আমাদের অবাক করে দেয়। তারা জ্বালানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার আগে সরাসরি উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা চালায়, এমনকি তুরস্কের দিকেও মিসাইল ছোড়ে। তাদের এই রণকৌশল আমাদের অপ্রস্তুত করে দিয়েছিল।"
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে নেতানিয়াহুর প্রভাব
অনেকে মনে করেন, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন 'বিবি' নেতানিয়াহুর প্ররোচনাতেই ট্রাম্প এই সিদ্ধান্ত নেন। তবে বেনাইম এই তত্ত্ব মানতে নারাজ। তিনি বলেন, "ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্য দেশের জন্য কিছু করেন, এমন প্রমাণ আমি দেখিনি। তিনি সেটাই করেন যা তিনি আমেরিকার জন্য ভালো বলে মনে করেন। আর তাঁর কাছে আমেরিকা মানে তাঁর নিজের আন্দোলন, নিজের ভাবমূর্তি এবং দেশের প্রতীক হিসেবে নিজের শক্তি।"
বেনাইম আরও বলেন, "আমার মনে হয়, তিনি (ট্রাম্প) এটা নেতানিয়াহুর জন্য করেননি, যদিও বিবি হয়তো হামলার পক্ষে কিছু জোরালো যুক্তি দিয়েছিলেন। তিনি এটা করেছিলেন কারণ তিনি পারতেন এবং তিনি ভেবেছিলেন যে খুব বেশি ক্ষতি ছাড়াই এটা করা সম্ভব। হতে পারে ইজরায়েল হয়তো একাই এই হামলা চালাত। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইজরায়েলে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয় এবং নেতানিয়াহুকে ২০২৬ সালে নির্বাচনে লড়তে হবে। ট্রাম্প যখন চান, তখন তাঁর হাতে চাল দেওয়ার মতো অনেক সুযোগ থাকে।"
'সহজাত প্রবৃত্তি কাজ করেনি': ইরানের মানসিকতা বুঝতে ভুল
বেনাইম স্বীকার করেন যে ট্রাম্প অন্যদের দুর্বলতা বুঝতে পারদর্শী, কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে তাঁর সেই "সহজাত প্রবৃত্তি কাজ করেনি"। তিনি বলেন, "আমার মনে হয়, ইরানের মানসিকতা বুঝতে তাঁর প্রবৃত্তি ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বোঝেননি যে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তারা ভেনেজুয়েলার ডেলসি রডরিগেজের মতো সহজে হার মানবে না। ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা খোমেইনির একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, 'আমি তরমুজের দাম বদলানোর জন্য এই বিপ্লব করিনি'।"
প্রসঙ্গত, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬-এ মার্কিন সেনা ভেনেজুয়েলায় "অপারেশন অ্যাবসলিউট রিসলভ" নামে একটি সামরিক অভিযান চালায়, যার ফলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়। রডরিগেজ তখন উপ-রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
বাড়তে থাকা সংঘাত ও বিশ্বজোড়া প্রভাব
বেনাইম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই ধরনের ভুল গণনার ফলে বিশ্বজুড়ে আমেরিকার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশেষ করে এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সময়ে।
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত ২১ দিনে পড়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইজরায়েলি যৌথ হামলায় ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর, ছেলে মোজতাবা খামেনেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন।
এর পর থেকেই আমেরিকা-ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। দু'পক্ষই মিসাইল হামলা ও সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়েছে। ইজরায়েল ইরানের গ্যাস ক্ষেত্রে হামলা চালানোর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরান চাপ সৃষ্টি করায় তেল, গ্যাস এবং সমুদ্র বাণিজ্যের পথ ব্যাহত হচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।


