ইজরায়েলের রাজনীতিতে বড় চমক। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর '৭ অক্টোবরের সরকার'-কে সরাতে একজোট হল বিরোধী শিবির। প্রধানমন্ত্রী পদে ইয়াশার দলের নেতা গাদি আইজেনকোটকে সমর্থন জানাল তারা।
ইজরায়েলের রাজনৈতিক পারদ এখন তুঙ্গে। দেশের 'চেঞ্জ অ্যান্ড রিপেয়ার' বা বিরোধী জোটের নেতারা প্রধানমন্ত্রী পদে ইয়াশার দলের প্রধান গাদি আইজেনকোটের নাম চূড়ান্ত করেছেন। তাঁরা প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগের কাছে আইজেনকোটের নামই প্রস্তাব করবেন। লক্ষ্য একটাই, দ্রুত ক্ষমতা দখল করে দেশের ৩৮তম সরকার গঠন করা।
বিরোধীদের ব্লুপ্রিন্ট
হারজলিয়া শহরে একটি শীর্ষ বৈঠকের পর বিরোধী জোটের নেতারা একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। সেখানে তাঁরা পরিষ্কার জানিয়েছেন, ২৬তম নেসেটে (ইজরায়েলের পার্লামেন্ট) তাঁদের যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, সেটা কাজে লাগিয়েই তাঁরা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন '৭/১০ সরকার'-কে সরাতে চান। দ্য টাইমস অফ ইজরায়েল জানিয়েছে, এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইয়াশার প্রধান গাদি আইজেনকোট, বি'য়াচাদ নেতা নাফতালি বেনেট ও তাঁর দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ইয়ার ল্যাপিড, ইজরায়েল বেইতেনু নেতা আভিগডর লিবারম্যান এবং ডেমোক্র্যাট চেয়ারম্যান ইয়ার গোলান।
জোটের নেতারা জানিয়েছেন, একবার সরকার গড়ার ডাক পেলেই তাঁরা দ্রুত কাজ শুরু করবেন। এক্স হ্যান্ডেলে (সাবেক টুইটার) আইজেনকোট একটি বিবৃতি শেয়ার করেছেন।
সেখানে লেখা হয়েছে, "দলের প্রধানদের চুক্তি অনুযায়ী, সবাই প্রেসিডেন্টকে ইয়েশ! পার্টির গাদি আইজেনকোটের নাম প্রস্তাব করবেন। উদ্দেশ্য হল, যত দ্রুত সম্ভব সরকার গঠন করা এবং ইজরায়েলকে ফের একটা নির্বাচনের দিকে ঠেলে না দেওয়া।"
বিরোধী জোটের দাবি, দেশের মানুষ নেতৃত্ব বদলের পক্ষেই রায় দিয়েছেন। আইজেনকোটের ঠিক করে দেওয়া চারটি জাতীয় নীতির ওপর ভিত্তি করে একটি 'জায়োনিস্ট সরকার' গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাঁরা।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "দেশের মানুষ স্পষ্ট ভাবে পরিবর্তনের পক্ষে এবং বর্তমান সরকারের (৭ অক্টোবরের সরকার) মেয়াদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। সেই রায়কে সম্মান জানাতে আমরা বদ্ধপরিকর। নেসেটের প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য আমরা সবরকম পরিকল্পনা সেরে ফেলেছি।"
বর্তমান শাসক দল যেভাবে নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তারও কড়া সমালোচনা করেছেন বিরোধী নেতারা।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "লিকুদ পার্টি এবং নেতানিয়াহু নির্বাচনের ফল ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যে বিপজ্জনক এবং ভিত্তিহীন প্রচার চালাচ্ছেন, তা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। নির্বাচনের ফল এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষায় আমরা একশো শতাংশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"
নতুন সরকারের রূপরেখা তৈরির জন্য দলের আলোচকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত বিরোধী জোট নিজেদের মধ্যে এই সমন্বয় বজায় রাখবে বলেও জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট দলের চেয়ারম্যান ইয়ার গোলান সকালে জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন এবং আহমেদ তিবির সঙ্গে দেখা করেছেন। নির্বাচনের পর এটাই তাঁদের প্রথম বৈঠক।
ডেমোক্র্যাট দলের তরফে জানানো হয়েছে, নেতানিয়াহু সরকারকে সরাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে তিন নেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
পাশাপাশি, আরব সম্প্রদায়ের মূল সমস্যাগুলো এবং তার বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়েও কথা হয়েছে।
ডেমোক্র্যাট পার্টি জানিয়েছে, "একটি 'পরিবর্তনের সরকার' গড়ার লক্ষ্যে আগামী দিনেও দুই পক্ষ সমন্বয় বজায় রেখে চলবে।"
সরকার গড়তে আরব দলগুলোর সঙ্গে হাত মেলানোর পক্ষে খোলাখুলি সওয়াল করেছেন গোলান। চার দলের ইহুদি-নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটে তিনিই একমাত্র নেতা, যিনি প্রকাশ্যে এই অবস্থান নিয়েছেন।
তবে জোটের অন্য নেতারা আরব দলগুলোর সঙ্গে বসতে নারাজ। দ্য টাইমস অফ ইজরায়েলের খবর অনুযায়ী, ইজরায়েল বেইতেনু চেয়ারম্যান আভিগডর লিবারম্যানও আরবদের সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার গড়ার প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছেন।
এক্স হ্যান্ডেলে লিবারম্যান লিখেছেন, "আমাদের আরও একটা নির্বাচন আটকাতেই হবে। এখন যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে ঠিকমতো এগোলে রাম (Ra'am) এবং জয়েন্ট লিস্টের সাহায্য ছাড়াই একটা স্থিতিশীল সরকার গড়া সম্ভব।"
নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া
নির্বাচনের পর এই টানাপোড়েনের মধ্যেই সোমবার ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তিনি একটি বৃহত্তর জাতীয় সরকার গড়তে রাজি, কিন্তু আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোনও সরকার তিনি চান না। এক্স-এ তিনি দাবি করেন, ইজরায়েলের সাধারণ মানুষ এমন কোনও সরকার চায় না যা রাম এবং জয়েন্ট লিস্টের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর অভিযোগ, এই দলগুলো সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে এবং ইহুদি রাষ্ট্রের অস্তিত্বই স্বীকার করে না।
নেতানিয়াহুর দাবি, তাঁর লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে আসায় ইহুদিদের সমর্থন তাঁর দিকেই রয়েছে। তিনি জানান, সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে না এমন যে কোনও দলের সঙ্গে সরকার গড়তে তিনি প্রথম দিন থেকেই প্রস্তুত। আর এর পরেই বিকল্প সরকার গড়তে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিরোধীরা।
১২০ আসনের নেসেটে বিরোধী জোট পেয়েছে ৬৭টি আসন, আর বর্তমান শাসক জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। তবে আরব দলগুলোর সাহায্য ছাড়া সরকার গড়া বিরোধীদের কাছেও একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ রাজনৈতিক নেতাদের নমনীয় হওয়ার এবং ফের নির্বাচন এড়ানোর পথ খোঁজার আর্জি জানিয়েছেন। ৪ নভেম্বর তিনি নির্বাচনের সরকারি ফল হাতে পাবেন। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করবেন তিনি। আগামী ১০ নভেম্বর নতুন নেসেটের শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে।




