Luxury Cruise Villa: স্বপ্ন ভেঙে বাস্তবে ফেরা বোধহয় একেই বলে। নিজেদের ঘরবাড়ি বিক্রি করে কেউ উঠেছিলেন জাহাজে, কেউ আবার অবসরের সঞ্চয়ের বড় অংশ ঢেলেছিলেন সমুদ্রে ভাসমান বিলাসবহুল আস্তানায়। স্বপ্ন ছিল একই বাড়িতে বছরের পর বছর কাটাতে হবে না।
Luxury Cruise Villa: স্বপ্ন ভেঙে বাস্তবে ফেরা বোধহয় একেই বলে। নিজেদের ঘরবাড়ি বিক্রি করে কেউ উঠেছিলেন জাহাজে, কেউ আবার অবসরের সঞ্চয়ের বড় অংশ ঢেলেছিলেন সমুদ্রে ভাসমান বিলাসবহুল আস্তানায়। স্বপ্ন ছিল, আর পাঁচটা মানুষের মতো একই বাড়িতে বছরের পর বছর কাটাতে হবে না। বরং জাহাজে ঘর বেঁধেই ঘুরে বেড়াবেন দেশ থেকে দেশান্তরে। কখনও এশিয়া, কখনও ইউরোপ, কখনও আবার আমেরিকা, সমুদ্রের বুকেই হবে তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা। কিন্তু সেই স্বপ্নে আচমকাই জল ঢেলে দিল জ্বালানি সংকট আর আর্থিক টানাপড়েন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল 'ভিলা ভি ওডিসি'। মাঝসমুদ্রে নয়, শেষ পর্যন্ত কম্বোডিয়ার বন্দরে থমকে গেল বিলাসবহুল ক্রুজের চাকা। আর মাত্র সাত ঘণ্টার নোটিসে জাহাজ ছাড়ার নির্দেশ পেয়ে কার্যত অথৈ জলে পড়লেন প্রায় ২০০ জন যাত্রী।
কী পরিকল্পনা ছিল
ঘটনার কেন্দ্রে মার্কিন সংস্থা 'ভিলা ভি রেসিডেন্স'-এর পরিচালিত বিলাসবহুল জাহাজ 'ভিলা ভি ওডিসি'। সংস্থার পরিকল্পনা ছিল, প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে ১৫০টিরও বেশি দেশ ঘুরবে এই ভাসমান আস্তানা। কিন্তু বিশ্বভ্রমণের সেই পরিকল্পনা এখন বড়সড় অনিশ্চয়তার মুখে। কম্বোডিয়ার সিহানুকভিল বন্দরে পৌঁছনোর পরই যাত্রীদের জানানো হয়, আপাতত বন্ধ রাখতে হচ্ছে সফর। ফলে আচমকা বিদেশের মাটিতে থাকার জায়গা, যাতায়াত এবং দেশে ফেরার ব্যবস্থা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা।
দেখুন ভিডিও
কী কারণে মাঝপথে বন্ধ সফর
কিন্তু কী এমন হয়েছিল যে মাঝপথে সফর বন্ধ করে দিতে হল? সংস্থার বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান পরিচালন খরচ সামলানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে দাবি সংস্থার। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ব্যয়বহুল পরিষেবা চালিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের হাতে নেই।
বাড়ি বিক্রি করে জাহাজে ঘর!
এই ক্রুজের যাত্রীদের কাছে জাহাজটি নিছক ছুটি কাটানোর মাধ্যম ছিল না। বরং অনেকের কাছেই সেটাই ছিল বাড়ি। ক্যাবিনের ধরন অনুযায়ী, স্থায়ী মালিকানা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি থাকার বন্দোবস্তের জন্য খরচ করেছিলেন প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার থেকে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার ডলার। অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ নাগরিকদের পাশাপাশি ছিলেন দূর থেকে কাজ করা পেশাদারেরাও। তাঁদের কেউ কেউ নিজেদের বাড়ি এবং অন্যান্য সম্পত্তি বিক্রি করেই এই অভিনব জীবনযাত্রার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবরে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল 'ভিলা ভি ওডিসি'। প্রাথমিক পর্যায়ে জাহাজের মেরামতির জন্য বেশ কিছুটা সময় নষ্ট হলেও পরে সফর এগোচ্ছিল। প্রায় ৭৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলার পর ২৩ অক্টোবর ২০২৬-এ তাইল্যান্ড পেরিয়ে ২০৩ জন যাত্রী এবং ১৫৬ জন ক্রু সদস্যকে নিয়ে কম্বোডিয়ার সিহানুকভিল বন্দরে পৌঁছয় জাহাজটি। এর পরের গন্তব্য ছিল ভিয়েতনাম। কিন্তু সেই যাত্রা আর শুরু করা গেল না।
জ্বালানির খরচ এক লাফে কয়েক গুণ!
সংস্থার দাবি, এশিয়ার বিভিন্ন রুটে চলাচলের সময় প্রতি ক্যাবিনের গড় মাসিক জ্বালানি খরচ ১,৮০০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৬,০০০ থেকে ৮,০০০ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, খরচের বোঝা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় পরিষেবা চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। জাহাজের গতি কমিয়ে কিংবা বন্দরে বেশি সময় কাটিয়ে ব্যয় কমানোর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়নি। আবার বাড়তি খরচের পুরোটা যাত্রীদের উপর চাপিয়ে দেওয়াও সম্ভব ছিল না বলে সংস্থার দাবি। এর পরেই আসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। ২৮ অক্টোবর, বুধবার পরিষেবা স্থগিত করার কথা জানিয়ে যাত্রীদের মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যে জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এত অল্প সময়ের নোটিসে মালপত্র গুছিয়ে নতুন করে থাকার ব্যবস্থা করা নিয়ে বিপাকে পড়েন যাত্রীরা। কম্বোডিয়ার স্থানীয় প্রশাসনের আধিকারিকেরাও ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
থাকার খরচ দেবে সংস্থা, বিমানভাড়ার দায় নয়!
আপাতত কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া যাত্রীদের সাময়িক থাকার ব্যবস্থা এবং স্থানীয় যাতায়াতের খরচ বহন করার কথা জানিয়েছে সংস্থা। কিন্তু দেশে ফেরার বিমানভাড়া কিংবা অন্য গন্তব্যে যাওয়ার খরচ তারা দেবে না বলেই জানানো হয়েছে। ফলে বিপুল টাকা খরচ করে সমুদ্রযাত্রায় নামা যাত্রীদের এখন নতুন করে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। জাহাজটি আপাতত বন্দরে নোঙর করা রয়েছে। জরুরি কাজ সামলানোর জন্য কিছু ক্রু সদস্যকে রাখা হয়েছে। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে নতুন বিনিয়োগ জোগাড় করা কিংবা সংস্থার আর্থিক পুনর্গঠনের চেষ্টা চালানো হবে বলে জানানো হয়েছে। যে জাহাজে চেপে পৃথিবী ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন যাত্রীরা, সেই জাহাজই এখন তাঁদের কাছে অনিশ্চয়তার প্রতীক। সমুদ্রের বুকে বিলাসবহুল জীবন কাটানোর স্বপ্ন ছিল, অথচ বাস্তবে বিদেশের বন্দরে নেমে নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে হচ্ছে তাঁদের। বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন যে এ ভাবে মাঝপথে থমকে যেতে পারে, তা হয়তো কল্পনাও করেননি কেউ।






