'হ্যাঙ্গর' নামটি ইতিহাসের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সাবমেরিন 'পিএনএস হ্যাঙ্গর' ভারতের যুদ্ধজাহাজ 'আইএনএস খুকরি'-কে ডুবিয়ে দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ভারতীয় নৌবাহিনীর কোনও যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার সেটিই ছিল প্রথম ঘটনা। 

'হ্যাঙ্গর' নামটি ইতিহাসের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সাবমেরিন 'পিএনএস হ্যাঙ্গর' ভারতের যুদ্ধজাহাজ 'আইএনএস খুকরি'-কে ডুবিয়ে দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ভারতীয় নৌবাহিনীর কোনও যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার সেটিই ছিল প্রথম ঘটনা এবং এটি ছিল পাকিস্তান নৌবাহিনীর অন্যতম আলোচিত ও সফল নৌ-অভিযান। তবে 'আইএনএস খুকরি' ডুবে যাওয়ার ঘটনাটি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ফলাফলে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। পাকিস্তান শোচনীয় পরাজয়ের শিকার হয়েছিল। স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করেছিল।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

১৯৭১ সালে বঙ্গোপসাগর থেকে পাকিস্তানের উপস্থিতি মুছে যাওয়ার মতো সেই বিপর্যয়কর পরাজয়ের ৫৫ বছর পর, পাকিস্তানের আরেকটি 'হ্যাঙ্গর ' (সাবমেরিন) এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। গত এপ্রিলে চিনে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রথম 'হ্যাঙ্গর ক্লাস' সাবমেরিনটি গত সপ্তাহে করাচিতে এসে পৌঁছয়। পাকিস্তানের নৌবাহিনীর একজন সিনিয়র কর্তার মতে, এই সাবমেরিনটি ইসলামাবাদকে বঙ্গোপসাগরে উপস্থিতি বজায় রাখার সক্ষমতা দিতে পারে। এটি তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরের একটি অঞ্চল, যেখানে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর থেকে—যখন পাকিস্তান তার ভূখণ্ডের অর্ধেক হারিয়েছিল—দেশটির নৌ-উপস্থিতি ছিল নগণ্য।

'নতুন হ্যাঙ্গর সাবমেরিন বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের উপস্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করবে'

১৯৭১ সালে ভারতীয় বাহিনীর কাছে নৌবাহিনীসহ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী পরাজিত হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানের নৌ-উপস্থিতি মূলত উত্তর আরব সাগরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এর বিপরীতে, বঙ্গোপসাগর ঐতিহাসিকভাবেই এমন একটি অঞ্চল যেখানে ভারত ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে উল্লেখযোগ্য সুবিধা ভোগ করে আসছে। বিশাখাপত্তনমে ভারতের 'ইস্টার্ন নেভাল কমান্ড'-এর অবস্থান এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নৈকট্যের কারণে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগর ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কা—এই দেশগুলো বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী রাষ্ট্র। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী নৌ-শক্তিগুলোর উত্থানের প্রেক্ষাপটে এই জলরাশিটি এখন ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বও লাভ করেছে। এ কারণেই চলতি মাসের শুরুর দিকে শ্রীলঙ্কায় পাকিস্তানের নৌবাহিনীর এক সিনিয়র কর্তার করা মন্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ।

কলম্বো-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম 'দ্য মর্নিং'-এর তথ্য অনুযায়ী, নতুন সাবমেরিনটিকে দেশে নিয়ে আসার দায়িত্বে থাকা নৌবহরের কমান্ডার কমোডর ওমর ফারুক বলেছেন যে, 'হ্যাঙ্গর ক্লাস' সাবমেরিন যুক্ত হওয়ার ফলে বঙ্গোপসাগরে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখার সক্ষমতা অর্জন করবে পাকিস্তান। ফারুক এই সাবমেরিনটিকে একটি "গেম চেঞ্জার" বা পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো বিষয় হিসেবে অভিহিত করেন এবং উল্লেখ করেন যে, পাকিস্তান এই শ্রেণির আটটি সাবমেরিন বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে—এমনটাই ৭ জুন 'দ্য মর্নিং'-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়।

'পিএনএস হ্যাঙ্গর '-এর আগমনের আগে পাকিস্তান নৌবাহিনীর হাতে পাঁচটি সাবমেরিন ছিল। চিনের তৈরি নতুন 'হ্যাঙ্গর ক্লাস' সাবমেরিনগুলো মূলত তাদের পুরনো 'আগস্টা' (Agosta) শ্রেণির সাবমেরিনগুলোর স্থলাভিষিক্ত হবে। এ থেকে বোঝা যায়, ইসলামাবাদ কেবল নিজেদের উপকূলীয় প্রতিরক্ষার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না; বরং তারা ভারত মহাসাগরে নিজেদের কার্যক্রমের পরিধি আরও বিস্তৃত করতে চাইছে। এর ফলে গভীর সমুদ্রে ভারতীয় নৌবাহিনীর সঙ্গে তাদের মুখোমুখি অবস্থানের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। বঙ্গোপসাগর কোনও একক দেশের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের উপকূলরেখা থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল (২২ কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্রসীমার উপর সার্বভৌমত্ব এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল (৩৭০ কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত 'এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন' বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (EEZ) উপর সার্বভৌম অধিকার ভোগ করে। এই সীমার বাইরে রয়েছে আন্তর্জাতিক জলসীমা, যেখানে এমনকি বিদেশি সামরিক জাহাজগুলোর চলাচলের ক্ষেত্রেও সাধারণত বড় ধরনের কোনও বাধা থাকে না।