রবিবার বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন অভিযোগ করেছেন যে, হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাশকে 'অবৈধভাবে' গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়কে একজোট করার কারণেই তাঁকে টার্গেট করা হয়েছে। এদিকে, দুটি মামলায় জামিন পেয়েছেন চিন্ময়।
বাংলাদেশি লেখিকা ও সমাজকর্মী তসলিমা নাসরিন রবিবার হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের "বেআইনি গ্রেপ্তার"-এর বিরুদ্ধে মুখ খুললেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়কে একজোট করার চেষ্টার কারণেই হয়তো তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একটি সাংবাদিক বৈঠকে তসলিমা বলেন, "আমি চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর বেআইনি গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ করেছি। সরকার কেন তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে, তা আমরা জানি না। আমার মনে হয়, চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভু যেভাবে হিন্দু সমাজকে একজোট করছিলেন, সেটাই এর কারণ।"
গ্রেফতার চিন্ময়কৃষ্ণ দাস
প্রসঙ্গত, ইসকনের প্রাক্তন নেতা এবং বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তাঁর গ্রেপ্তারের পরেই দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। ২৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম আদালত ভবনের বাইরে তাঁর অনুগামীদের সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হিংসাত্মক সংঘর্ষও হয়।
এরই মধ্যে রবিবার বাংলাদেশের হাইকোর্ট দুটি মামলায় এই হিন্দু সন্ন্যাসীকে জামিন দিয়েছে বলে জানিয়েছেন এক আইনজীবী।
২ মামলাতে জামিন
চিন্ময়ের আইনজীবী অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য ফোনে এএনআই-কে জানিয়েছেন, "বাংলাদেশ হাইকোর্ট চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া চারটি মামলার মধ্যে দুটিতে জামিন মঞ্জুর করেছে। এই মামলাগুলির মধ্যে ছিল খুনের চেষ্টা, ভাঙচুর, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং এই সংক্রান্ত আরও কিছু অভিযোগ। হাইকোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ আজ এই জামিনের নির্দেশ দিয়েছে।" বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার এবং বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই জামিন মঞ্জুর করে। বাকি দুটি মামলায় জামিনের আবেদনের শুনানির জন্য আগামী ১৬ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর, জাতীয় পতাকার অবমাননার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় চিন্ময়ের জামিনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সময় আইনজীবী সইফুল ইসলামকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার পর তাঁর বাবা জামাল উদ্দিন ৩১ জনকে অভিযুক্ত করে একটি খুনের মামলা দায়ের করেন। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি, চট্টগ্রামের বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনজীবী খুনের ঘটনায় ইসকনের প্রাক্তন নেতা চিন্ময় দাস-সহ আরও ৩৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে। এর মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এর আগে, গত বছরের ৩০ এপ্রিল, হাইকোর্ট রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় (জাতীয় পতাকার 'কথিত' অবমাননা) তাঁকে জামিন দিয়েছিল। কিন্তু পরে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপেলেট ডিভিশন সেই আদেশে স্থগিতাদেশ দেয়। ২০২৪ সাল জুড়ে, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অপসারণের পর চিন্ময় দাসের সংগঠন 'সম্মিলিত সনাতন জাগরণ জোট' একাধিক সমাবেশের আয়োজন করে। হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর 'কথিত' হামলা এবং বৈষম্যের প্রতিবাদে এই সমাবেশগুলি করা হয়েছিল।
২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার প্রায় আট শতাংশ হিন্দু।
চিন্ময় দাসের আটককে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কেও উত্তাপ ছড়িয়েছিল। ভারত এর আগে তাঁর 'কথিত' দুর্ব্যবহার এবং একটানা আটকে রাখা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। চিন্ময় দাস বাংলাদেশের হিন্দু (সনাতনী) সম্প্রদায়ের জন্য বরাবরই সোচ্চার। তিনি সংখ্যালঘুদের জন্য সুরক্ষা আইন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ট্রাইব্যুনাল এবং একটি সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় তাঁর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছে।


