ইরানের হুঁশিয়ারিতে কি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হতে চলেছে? চুক্তি ব্যর্থ হলে ডোনাল্ড ট্রাম্প কি জাহাজের ওপর মার্কিন টোল বসিয়ে নতুন আর্থিক চাপ তৈরি করবেন? লেবাননে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়া কি আমেরিকা-ইরান আলোচনাকে লাইনচ্যুত করবে? সুইজারল্যান্ডের বৈঠক কি শান্তি আনবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে?
Trump Hormuz Strait Toll: মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে এমন এক খবর সামনে এসেছে, যা গোটা বিশ্বের বাজার এবং কূটনীতিকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক চমকে দেওয়ার মতো মন্তব্য করেছেন, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রীতিমতো আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যদি ইরানের সঙ্গে বহু প্রতীক্ষিত 'মহা-চুক্তি' ব্যর্থ হয়, তাহলে আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ—হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz)—দিয়ে যাওয়া জাহাজের ওপর 'ইউএস টোল' বসানোর কথা ভাবতে পারে। ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য আমেরিকার ভূমিকাকে এক 'গার্জিয়ান অ্যাঞ্জেল' বা রক্ষাকর্তার মতো বলে ব্যাখ্যা করেছেন। প্রশ্ন উঠছে, আমেরিকা কি এই সামুদ্রিক পথের ওপর একতরফাভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে?

'ট্রুথ সোশ্যালে' ট্রাম্পের বিস্ফোরণ: ৬০ দিনের আল্টিমেটাম আর কোটি কোটি ডলারের বিল!
আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে এই নতুন উত্তেজনার সূত্রপাত হয় যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ একটি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক পোস্ট করেন। ট্রাম্প পরিষ্কার ভাষায় বলেন, সুইজারল্যান্ডে শান্তি আলোচনার অঙ্গ হিসেবে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় হরমুজ দিয়ে যাওয়া জাহাজের ওপর কোনো টোল লাগবে না। কিন্তু আসল সাসপেন্স শুরু হবে ৬০ দিন পর। যদি ইরানের সঙ্গে কোনো বড়সড় ও পাকাপোক্ত চুক্তি না হয়, তাহলে আমেরিকা এই রুটে মোটা অঙ্কের টোল আদায় শুরু করবে। ট্রাম্পের যুক্তি, আমেরিকা 'গার্জিয়ান অ্যাঞ্জেল' হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে যে নিরাপত্তা দিয়েছে, তার অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের খরচ এই টোল ট্যাক্স থেকে উসুল করা হবে। এই बयान বিশ্ব বাণিজ্য এবং অপরিশোধিত তেলের সাপ্লাই চেইনে এক নতুন বিপদের ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে, যা বিশ্বকে বড় আর্থিক সংকটের মুখে ফেলতে পারে।
ইরানের সেই ভয়ঙ্কর হুঁশিয়ারি: 'আমাদের পথে এলে ঝুঁকি আপনার'
ট্রাম্পের এই বিবৃতির ঠিক আগেই ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এক বিশ্ব কাঁপানো ঘোষণা করে। ইরান দাবি করে, লেবাননে ইজরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিবাদে তারা হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, তারা যেন এই পথ থেকে দূরে থাকে। যে জাহাজই এই পথে প্রবেশ করবে, তার জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি তাকেই নিতে হবে। এই ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে শক্তি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যায়, কারণ বিশ্বের তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রধান পথই হলো হরমুজ। যদিও, এই দাবির মধ্যেই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক दिलचस्प তথ্য দিয়ে জানিয়েছে যে বাস্তব চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন; শনিবারও ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ সেখান থেকে নিরাপদে পার হয়েছে, যেগুলিতে ১৭ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল ছিল।
লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে গভীর সংকট: আবার কি বড় যুদ্ধ শুরু হবে?
এই টানাপোড়েনের মধ্যে লেবাননে হওয়া যুদ্ধবিরতি এখন অত্যন্ত দুর্বল সুতোয় ঝুলছে। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে ৬০ দিনের আলোচনা শুরু করার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তই ছিল লেবাননে লড়াই পুরোপুরি বন্ধ রাখা। কিন্তু বাস্তবে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননে আবার বোমা বর্ষণ শুরু হয়। লেবাননের সিভিল ডিফেন্সের মতে, ইজরায়েলি হামলায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ইজরায়েলের বক্তব্য, এই হামলা হিজবুল্লাহর আক্রমণের জবাবে করা হয়েছে, অন্যদিকে হিজবুল্লাহর দাবি, তারা ইজরায়েলকে অবাধে ঘোরাফেরা করতে দেবে না। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবেরও 'X' প্ল্যাটফর্মে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যতক্ষণ না আমেরিকা এই ১৪-দফা চুক্তি পুরোপুরি কার্যকর করছে, ততক্ষণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে শক্তি সরবরাহে বাধা আসতেই থাকবে।
সুইজারল্যান্ডে মহাশক্তিদের বৈঠক: জেডি ভ্যান্স ও ইরানি প্রতিনিধিদের গোপন কৌশল
এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই সুইজারল্যান্ডের বরফ ঢাকা উপত্যকায় এক অত্যন্ত গোপনীয় এবং হাই-স্টেক বৈঠকের মঞ্চ তৈরি হয়েছে। ইরানের এক শক্তিশালী প্রতিনিধিদল, যার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি, সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছে। এই দলে ইরানের নিরাপত্তা এজেন্সি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং তেল ক্ষেত্রের শীর্ষ কর্মকর্তারাও রয়েছেন। অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ট্রাম্পের অত্যন্ত বিশ্বস্ত আলোচক জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ ইতিমধ্যেই সেখানে ঘাঁটি গেড়েছেন।
জেডি ভ্যান্স কী বললেন?
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই আলোচনার মাধ্যমে শুধু পরমাণু সমস্যার সমাধানই হবে না, লেবাননের সংকটও মিটবে। তিনি দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালী বাস্তবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো ইঙ্গিত তিনি পাননি। কিন্তু সাসপেন্স এখনও তুঙ্গে—সুইজারল্যান্ডের এই গোপন বৈঠক কি সফল হবে, নাকি বিশ্ব হরমুজে এক নতুন মার্কিন ট্যাক্স এবং ইরানের পাল্টা জবাবের সাক্ষী হবে? বিশ্বজুড়ে এনার্জি মার্কেটের নিঃশ্বাস এখন এই প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় থমকে আছে।


