আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘাত এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। আমেরিকার একাধিক প্রথম সারির মিডিয়া হাউসের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, দেশের একটা বড় অংশের মানুষ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান নীতি নিয়ে একেবারেই খুশি নন। অনেকেই মনে করছেন, এই যুদ্ধের ফলে আমেরিকায় জঙ্গি হামলার আশঙ্কা আরও বাড়তে পারে।
আমেরিকা আর ইরানের মধ্যে চলতে থাকা উত্তেজনা এখন আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে নেই। এর আঁচ এসে পড়েছে আমেরিকার অন্দরেও। সম্প্রতি আমেরিকার প্রথম সারির কয়েকটি মিডিয়া হাউসের করা সমীক্ষা থেকে ইঙ্গিত মিলছে যে, দেশের বহু মানুষ ইরানের ব্যাপারে তাদের প্রেসিডেন্টের নীতি ও সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট নন। শুধু তাই নয়, কিছু সার্ভেতে এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে যে এই যুদ্ধের কারণে আমেরিকার মাটিতে সন্ত্রাসবাদী হামলার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

এই সমীক্ষাগুলো আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্ক উস্কে দিয়েছে। একদিকে যখন হোয়াইট হাউস নিজেদের রণকৌশলকে সেরা বলে দাবি করছে, তখন অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশই এই গোটা অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।
ইরানে হামলার পরেও পরিস্থিতি বদলায়নি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ইজরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরানের ওপর একটি বড় সামরিক হামলা চালায়। এই অভিযানের পরেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই-এর মৃত্যুর খবর সামনে আসে। মনে করা হচ্ছিল, এই হামলার পর ইরানের শাসন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সেখানে একটা বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা যাবে।
কিন্তু পরিস্থিতি আশানুরূপ বদলায়নি। ইরানে না হয়েছে সরকার পতন, না তাদের শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বরং এখন দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা এবং উত্তেজনা কমানোর জন্য আলোচনার খবর সামনে আসছে।
চারটি বড় সার্ভেতে কী উঠে এল?
সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক টাইমস, এবিসি, সিএনএন এবং পিউ রিসার্চ-এর মতো বড় মিডিয়া সংস্থাগুলি ইরান যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকানদের মতামত জানতে সমীক্ষা চালায়। এই সব সার্ভেতে ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান উঠে এলেও একটা কথা প্রায় সব জায়গায় এক - দেশের একটা বড় অংশের মানুষ এই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এবং আমেরিকার নীতি নিয়ে চিন্তিত।
১. নিউ ইয়র্ক টাইমস-সিয়েনা সার্ভে
এই সার্ভেতে অংশ নেওয়া ৫০ শতাংশ মানুষের মতে, শুধুমাত্র সামরিক চাপ বা হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা যাবে না। মাত্র ২২ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে সামরিক শক্তি দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
সার্ভেতে অংশ নেওয়া ৫২ শতাংশ মানুষ বলেছেন, পরিস্থিতি যাতে আরও খারাপ না হয়, তার জন্য কোনও বড়সড় চুক্তি ছাড়াই যুদ্ধ শেষ করে দেওয়া উচিত।
২. ওয়াশিংটন পোস্ট-এবিসি এবং পিউ রিসার্চ সার্ভে
ওয়াশিংটন পোস্ট এবং এবিসি-র যৌথ সমীক্ষায় ৬৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে, কোনও চুক্তি হলেও ইরান গোপনে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাবে। তাদের মতে, আমেরিকা ইরানকে পুরোপুরি আটকাতে সফল হবে না।
একইভাবে, পিউ রিসার্চের সার্ভেতে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বলেছেন যে আমেরিকা ইরানে তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে না।
৩. সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি
এবিসি-র সার্ভেতে ৬১ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে ইরান যুদ্ধের পর আমেরিকানদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি বাড়তে পারে। वहीं, ৪৯ শতাংশ মানুষের মতে, এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও अस्थिर হয়ে উঠতে পারে।
প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষ এটাও মনে করেন যে এই যুদ্ধের কারণে অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে।
৪. CNN সার্ভেতে ট্রাম্পের নীতি নিয়ে প্রশ্ন
সিএনএন-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষায় ৫৯ শতাংশ মানুষ বলেছেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। মাত্র ২২ শতাংশ মানুষ তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা রেখেছেন।
এই পরিসংখ্যানগুলি এটাই দেখাচ্ছে যে আমেরিকার সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ এই যুদ্ধ নিয়ে দ্বিধা এবং উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।
আমেরিকান মিডিয়ার ওপর চটলেন ট্রাম্প
এই সার্ভে রিপোর্টগুলো সামনে আসার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকান মিডিয়ার ওপর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, যদি ইরান পুরোপুরি আত্মসমর্পণও করে, তাহলেও আমেরিকান মিডিয়া এটাকে আমেরিকার জয় হিসেবে দেখাবে না।
ট্রাম্প বিরোধী ডেমোক্র্যাট নেতা এবং মিডিয়া সংস্থাগুলোর ওপর আক্রমণ শানিয়ে তাদের "পথভ্রষ্ট" এবং "পাগল" পর্যন্ত বলেছেন। তাঁর অভিযোগ, মিডিয়া জেনেশুনে তাঁর বিদেশ নীতিকে দুর্বল দেখানোর চেষ্টা করছে।
যুদ্ধ নয়, এখন বিতর্ক রণকৌশল নিয়ে
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পর এখন আমেরিকার অন্দরে আসল বিতর্কটা যুদ্ধ নিয়ে ততটা নয়, যতটা তার রণকৌশল এবং ফলাফল নিয়ে। প্রশ্ন উঠছে, লাগাতার সামরিক চাপে কি সত্যিই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি রোখা সম্ভব, নাকি এতে ওই অঞ্চলে অস্থিরতা আরও বাড়বে?
এর সঙ্গেই সন্ত্রাসবাদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আগামী দিনে যদি আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আলোচনা এগোয়, তবে এটা দেখা গুরুত্বপূর্ণ হবে যে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমে, নাকি পরিস্থিতি আরও জটিল দিকে মোড় নেয়।


