২০২৬ সালের মিডটার্ম নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের কাছে হারের পর হোয়াইট হাউস ১৩ দফার একটি কড়া ইসতেহার প্রকাশ করেছে। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগুলো রক্ষার পাশাপাশি বিরোধীদের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে।

২০২৬ সালের মিডটার্ম নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। তবে হোয়াইট হাউস আপসের পথে না হেঁটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগুলোকে কড়া ভাষায় সমর্থন করেছে। বিরোধী শিবিরের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিরুদ্ধে তারা রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

১৩ দফা দাবি ট্রাম্পের

এক বিবৃতিতে প্রশাসন ১৩ দফার একটি ইসতেহার প্রকাশ করেছে। সেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সমালোচক মিডিয়া এবং 'প্রফেশনাল প্যানিক ক্লাস'-কে নিশানা করা হয়েছে। তারা সাফ জানিয়েছে, প্রশাসনের পতনের যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছে, তা আবারও ভুল প্রমাণিত হবে।

হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "যখনই র‍্যাডিক্যাল লেফট, ফেক নিউজ এবং প্রফেশনাল প্যানিক ক্লাস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়েছে, তারা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এবারও তারা ভুল প্রমাণিত হবে।" ক্যাপিটল হিলে ক্ষমতার পালাবদল হতে চলেছে। তার আগেই এই কড়া বার্তার মাধ্যমে প্রশাসন নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক কৌশল স্পষ্ট করে দিল।

ডেমোক্র্যাটদের নিশানা ট্রাম্পের

প্রশাসনের কাজ এবং ডেমোক্র্যাটদের আগামী দিনের এজেন্ডার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টেনেছে হোয়াইট হাউস। তারা জানিয়েছে, ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরে তার মূল নীতিগুলো বাতিলের যে চেষ্টা বিরোধীরা করবে, তা নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যা যা করেছেন, তার মেয়াদের শেষ দুই বছরে ডেমোক্র্যাটরা সেসব বাতিল করার চেষ্টা করবে এবং ব্যর্থ হবে।" এর পাশাপাশি প্রশাসনের রক্ষণশীল অর্জনগুলোর একটি তালিকাও দেওয়া হয়েছে, যা তারা রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর।

প্রশাসনের নীতি

প্রশাসন বেশ কিছু নীতির কথা উল্লেখ করেছে যেখানে সংঘাত হতে পারে। তারা সতর্ক করেছে যে, ডেমোক্র্যাটরা "সুরক্ষিত সীমান্ত আবার খুলে দেওয়ার চেষ্টা করবে, রেকর্ড অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পর কর বাড়াবে, আইনশৃঙ্খলা দুর্বল করবে এবং ব্যাপক হারে অবৈধ অভিবাসীদের দেশে ঢোকাবে।"

বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, ডেমোক্র্যাটরা "গ্রিন নিউ ডিল আবার চালু করতে চাইবে, জ্বালানি খাতের আধিপত্য ছেড়ে দেবে, অপ্রাপ্তবয়স্কদের লিঙ্গ পরিবর্তনের সার্জারি আবার শুরু করবে, বর্ণভিত্তিক ডাইভারসিটি, ইক্যুইটি অ্যান্ড ইনক্লুশন (ডিইআই) প্রোগ্রাম ফিরিয়ে আনবে, সেন্সরশিপ ব্যবস্থা নতুন করে গড়বে, দুর্নীতি ও অপচয়ের রাস্তা খুলবে, অপরাধী অবৈধদের আড়াল করবে, সুপ্রিম কোর্টে নিজেদের লোক বসাবে এবং 'আরেকটি ইমপিচমেন্ট নাটক' শুরু করবে।"

হোয়াইট হাউসের এই বিবৃতি দুটি কাজ করেছে। একদিকে তারা হতাশ রিপাবলিকান সমর্থকদের আশ্বস্ত করেছে, অন্যদিকে ক্যাপিটল হিলকে কড়া বার্তা দিয়েছে যে, আইন বাতিলের চেষ্টা রুখতে প্রশাসন প্রেসিডেন্সিয়াল ভেটোসহ নিজেদের ক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করবে।

মিডটার্ম ভোটোর ফলাফল জনাদেশ নয়: ট্রাম্প

মিডটার্ম নির্বাচনের ফলাফলকে হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধে জনাদেশ হিসেবে মানতে নারাজ প্রশাসন। তারা একে সাময়িক রাজনৈতিক বাধা হিসেবে দেখছে। তাদের দাবি, ভোটাররা শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের মূল কাজগুলোকেই সমর্থন করে।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, "এই চেষ্টাগুলো ব্যর্থ হবে; আমেরিকার মানুষ আগেই এই এজেন্ডা প্রত্যাখ্যান করেছে।" তাদের যুক্তি, সীমান্ত নিরাপত্তা, জ্বালানি স্বাধীনতা এবং ডিইআই প্রোগ্রাম বাতিলের মতো বিষয়গুলো মানুষের মনে গেঁথে আছে।

ইমপিচমেন্টের আশঙ্কা মার্কিন প্রেসিডেন্টের

বিবৃতিতে বলা হয়, "তাকে ইমপিচ করার, তার এজেন্ডা কেড়ে নেওয়ার বা প্রশাসনের অর্জনগুলো বাতিল করার চেষ্টা র‍্যাডিক্যাল লেফটদের আগের চেষ্টাগুলোর মতোই ব্যর্থ হবে।" রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়ে হোয়াইট হাউস বুঝিয়ে দিয়েছে, আগামী দুই বছর তারা তীব্র প্রশাসনিক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। বিবৃতিতে ঘোষণা করা হয়, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লড়াই থামাবেন না।"

এর ঠিক এক দিন আগেই ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের একটি মূল্যায়নের সঙ্গে একমত হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভ্যান্স বলেছিলেন, ২০২৬ সালের মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির হারের পেছনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ একটি বড় কারণ। ট্রাম্প স্বীকার করেন যে, এই সংঘাতের কারণে সাময়িকভাবে পেট্রোলের দাম বেড়েছিল। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়া থেকে আটকাতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি ছিল।

ভ্যান্সকে সমর্থন ট্রাম্পের

দলের হারের পেছনে ইরান যুদ্ধকে দায়ী করে ভ্যান্সের মন্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এই মূল্যায়ন "বেশিরভাগই সত্যি"। তবে তিনি এও জানান, সুযোগ পেলে তিনি আবারও একই সিদ্ধান্ত নিতেন।

ট্রাম্প বলেন, "আমার মনে হয় এটা অনেকটাই সত্যি, কারণ এর ফলে সাময়িকভাবে পেট্রোলের দাম কিছুটা বেড়েছিল। তবে একই সঙ্গে, আমাকে যদি আবার এটা করতে হয়, আমি আবারও করব। কারণ দীর্ঘমেয়াদে এটাই একমাত্র সমাধান। আপনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দিতে পারেন না।"

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও জানান, তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য ভোটে রূপান্তরিত হয়নি। তার দাবি, তার র‍্যালিগুলোতে যে উন্মাদনা দেখা গিয়েছিল, দল তা অন্য প্রার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, "আমি যদি ব্যালটে থাকতাম, আমরা জিততাম। আপনারা দেখেছেন, হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছিল... কিন্তু সেই ভালোবাসাটা শুধু ট্রান্সফার করা যায়নি। ওই র‍্যালিগুলোতে যে ভালোবাসা ছিল, তা অবিশ্বাস্য। আমরা সেই ভালোবাসা প্রার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে পারিনি।"

মিডটার্ম নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভালো ফলের পর প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দেন যে, তিনি তাদের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক। তবে তিনি সতর্ক করে দেন, তাদের আইনি এজেন্ডার সঙ্গে একমত না হলে তিনি তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।

ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা

ডেমোক্র্যাটরা তার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, "আমার মনে হয় তারা এমনটা করলে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ বিনা কারণে ইমপিচমেন্ট। কীসের জন্য? একটা সফল দেশ গড়ার জন্য? আমাদের দেশ এখন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সফল।"

২০২৬ সালের মিডটার্ম নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড়সড় প্রত্যাবর্তনের মাঝেই এসব কথা সামনে এল। মার্কিন নেটওয়ার্কগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, দলটি কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে, যা ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্য অনেকটাই বদলে দেবে।

হাউসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে তারা তদন্ত ও শুনানির মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়াতে পারবে। এছাড়া সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে আইন প্রণয়ন এবং প্রেসিডেন্টের মনোনয়নের ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়বে।