কাউন্টডাউন চলছিল, অপেক্ষা করা হচ্ছিল সিন্দুক খোলার ২০০ বছরেরও বেশি সময় আগে এই সিন্দুক তৈরি হয়েছিল একটি ব্রিটিশ সংস্থা এই সিন্দুকটি তৈরি করেছিল  কিন্তু, ট্রাস্টি বোর্ডের কিছু আইনি জটিলতায় সিন্দুক বন্ধ রাখতে হয়েছিল

খুলল রাজার খাজানা। খোদ কলকাতার বুকে যার দরজা বন্ধ হয়েছিল আড়াই দশক ধরে। এই খাজানা ভর্তি সিন্দুকের দরজার এতটাই শক্ত হয়ে এঁটেছিল যে চাবি দিয়ে তা খোলা যায়নি। ২ নভেম্বর কলকাতা হাইকোর্টের প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে এই সিন্দুকের দরজা খোলার চেষ্টা করেছিলেন শোভাবাজার রাজবাড়ির উত্তরসূরীদের একটি দল। শেষমেশ গোদরেজ সংস্থার শরণাপন্ন হন শোভাবাজার রাজবাড়ির সদস্যরা। অবশেষে সেই সিন্দুকের তালা কেটে দরজা খোলে গোদরেজ। ৩১ জানুয়ারি সেই সিন্দুক কাটার কাজ শেষ হয় এবং সামনে আসে হিরে-পান্না, সোনা আর রূপোয় মোড়া সব অলঙ্কার থেকে শুরু করে আরাধ্য দেবতার নানা সাজ-সরঞ্জাম। 

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

বিশেষ সূত্রে জানা গিয়েছে, উদ্ধার হওয়া এই খাজানায় রয়েছে অসংখ্য হিরে-পান্না-চূর্ণি বসানো খাঁটি স্বর্ণালঙ্কার। এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য সোনার চূড় থেকে শুরু করে ব্রেসলেট। স্বর্ণালঙ্কারগুলিতে বসানো হিরে-জহরতের আয়তন এটাই বিশাল যে চোখ ধাঁধিয়ে যেতে পারে। পাওয়া গিয়েছে অসংখ্য সোনার বাঁশি। তাতেও হিরে-পান্না-চূর্ণি খচিত রয়েছে। এছাড়াও মিলেছে বিশাল একটি দোলনা। যার পুরোটাই সোনার পাতে মোড়া। 

গোদরেজ থেকে ৮জনের একটি দল ৩১ জানুয়ারি শোভাবাজার রাজবাড়ির গোবিন্দজীর মন্দিরের লাগোয়া একটি ভবনে প্রবেশ করে। এই মন্দিরের দুই পাশে-র দুই ভবনেই গোবিন্দজীর খাজানা রাখা হয়েছে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। একটি পাশের খাজানার দরজা খোলা থাকলেও, অন্য সিন্দুকের দরজা বন্ধ রাখা হয়েছিল আড়াই দশক ধরে। কারণ, শোভাবাজার রাজবাড়ির ট্রাস্টি বোর্ড কিছু আইনি জটিলতায় জড়িয়ে গিয়েছিল। যার যেরে কলকাতা হাইকোর্টে এই খাজানার হেফাজত নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছিল। গত বছরের অক্টোবরে এই জটিলতা কিছুটা আলোচনার মাধ্যমে মেটানো সম্ভব হয়। এরপরই কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি আশিস চক্রবর্তী এক নির্দেশিকায় এই বন্ধ সিন্দুক খুলে খাজানার মূল্য নির্ধারণের নির্দেশ দেন। সেই মোতাবেক ২ নভেম্বর কলকাতা হাইকোর্টের একটি প্রতিনিধি দল শোভাবাজার রাজবাড়ির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের-কে সঙ্গে নিয়ে বন্ধ সিন্দুকের তালা খোলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু, দীর্ঘদিন ধরে তালায় চাবি না ঢোকানোয় সিন্দুকের দরজা খোলা যায়নি।

১ লক্ষ ৭৩ হাজার টাকার বিনিময়ে গোদরেজ সংস্থা বন্ধ সিন্দুক খুলে তাকে সচল করার দায়িত্ব নিয়েছে। জানা গিয়েছে, ৩১ জানুয়ারি কলকাতা হাইকোর্টের প্রতিনিধি দলটির সঙ্গে ট্রাস্টি বোর্ডের ৫ সদস্য বন্ধ সিন্দুকের ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানেই গোদরেজ সংস্থার ৮ কর্মী গ্যাস কার্টার দিয়ে সিন্দুকের দরজায় থাকা তালা কাটেন। মূল দরজা খুলতে সামনে আসে একটি গরাদ, যা অনেকটা জেলখানার মতো দেখতে। সেই গরাদের পিছনেই রয়েছে ২০০ স্কোয়ারফিটের একটি এয়ারটাইট ঘর। যেখানে কোনও-ধরনের আলো-বাতাস প্রবেশ করে না। বলতে গেলে লখিন্দরের লোহার বাসর ঘরের মতো। যদিও, লখিন্দরের সেই লোহার বাসর ঘরে একটা ছিদ্র ছিল, শোভাবাজার রাজবাড়ির এই ঘরে তেমন কোনও ছিদ্র পাওয়াই যায়নি। যার ফলে, স্বর্ণালঙ্কার এবং হিরে-জহরত একটুও খারাপ হয়ে যায়নি। 

লোহার গরাদ ঠেলে সেই ঘরে ঢুকতেই মেলে সারি সারি র্যাক। যেখানে রাখা ছিল দামি সমস্ত অলঙ্কার। সোনার অলঙ্কারের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ছিল গোবিন্দজীর বিভিন্ন সাজ-সরঞ্জাম। যাতে রূপোর অলঙ্কারও ছিল। মেলে বার্মিংহামে তৈরি একটি বিশাল ট্রাঙ্ক। এই ট্রাঙ্কের আয়তন এতটাই বিশাল যে চোখ তাক লেগে যাবে। সেই ট্রাঙ্কেও লাগানো ছিল একটি বিশাল তালা। ট্রাঙ্ক খুলে সামনে আসে তিনটি বড় বাক্স। সেখানেই থরে থরে ভরে রাখাছিল সোনার সব অলঙ্কার এবং হিরে-জহরত-পান্না। এই ট্রাঙ্কের একপাশেই রাখা ছিল একটি বিশাল দোলনা। যার পুরোটাই সোনার পাতে মোড়া। আপাতত এই সমস্ত স্বর্ণালঙ্কার গোদরেজের দেওয়া একটি সিন্দুকে ভরে রাখা হয়েছে। বসানো হয়েছে কড়া পুলিশি পাহাড়া। আদালতের পরবর্তি নির্দেশ মিললে তবে এই স্বর্ণালঙ্কারের মূল্য নির্ধারণের কাজ শুরু হওয়ার কথা। যদিও, এই খাজানা নিয়ে শোভাবাজার রাজবাড়ির কোনও সদস্যই কোনও ধরনের সরকারিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজি হননি। রাজা-বাদশার খাজানা নিয়ে গল্পকথার শেষ নেই। তেমনই এক গল্পকথা যেন এবার বাস্তবায়িত হল এই কলকাতার বুকে শোভাবাজার রাজবাড়িতে। সাত-রাজার মানিক ধন চাক্ষুষের লোভ যে সকলেরই আছে তা নিয়েও কোনও দ্বিমত নেই। তবে, শোভাবাজার রাজবাড়ির এই খাজানার পুরোটাই দেবোত্তর সম্পত্তি। মানে দেবতার জন্যই তা নিবেদিত। এতে অন্য কারোর কোনও অধিকার নেই। বংর এখন থেকে এই অলঙ্কার বিশেষ পুজোর দিনগুলিতে আরাধ্য দেবতার সাজসজ্জায় ব্যবহার করা যেতে পারে যদি আদালত তা করার নির্দেশ দেয়।