লকডাউন ভেঙে সোনারপুরের হোমে এইচআইভি আক্রান্ত শিশুদের প্রকাশ্য়ে আনায় তৃণমূলের সাংসদ মিমি চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে তোপ দাগলেন দিলীপ ঘোষ। বিজেপি রাজ্য় সভাপতি বলেন,প্রচারের লালসা থেকেই এই ধরনের নিকৃষ্ট কাজ করছে তৃণমূল। এইচআইভি পজিটিভ হওয়ায় এমনিতেই করোনা পরিস্থিতিতে ওই শিশুদের সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেক বেশি। সেইসব দিকে নজর না দিয়ে কেবল প্রচার পেতেই এই ধরনের কাজ করছেন তৃণমূলের সাংসদরা। 

এক সপ্তাহ কাটেনি। রাজ্য়ে লকডাউন নিয়ে পরপর দুদিন চিঠি পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। বাংলার বুকে কোথায় কোথায় লকডাউন ভাঙা হচ্ছে তার নাম উল্লেখ করে এসেছে হুঁশিয়ারি  চিঠি। কিন্তু তাতেও কাজ  হল না। লকডাউন ভেঙে সোনারপুরের এইচআইভি আক্রান্তদের অনুষ্ঠান দেখিয়ে দিল  'বাংলা আছে বাংলাতেই'। 

যদিও এশিয়ানেট নিউজ বাংলার এই খবর প্রকাশ্য়ে আসতেই সরব হয়েছে বিজেপি। দলের রাজ্য় সভাপতি দিলীপ ঘোষ এই ঘটনার জন্য় 'কাঠগড়ায়' তুলেছেন যাদবপুরের তৃণমূলের সাংসদকে। ফোনে এশিয়ানেট নিউজ বাংলাকে রাজ্য় বিজেপির  নেতা  বলেন ,'এত এদের প্রচার পাওয়ার নেশা, যেকারণে লকডাউনটা বাংলায় মানা হচ্ছে না। কেবল রাজ্নৈতিক স্বার্থে, প্রচারের স্বার্থে বার বার লকডাউন ভাঙা হচ্ছে। মুখ্য়মন্ত্রী নিজে লকডাউন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বার্তাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছেন। বলেছেন,উনি আগে নোটবন্দি করেছেন ,এখন ঘরবন্দি করছেন। রাজ্য়ের মুখ্য়মন্ত্রী এই ধরনের কথা বললে, করোনার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলা মানুষ কী করে করবে। স্বাভাবিকভাবেই রাজ্য়ে লকডাউনকে হাল্কাভাবে নেওয়া হচ্ছে।'  

এই বলেই থেমে থাকেননি মেদিনীপুরের সাংসদ। তাঁর অভিযোগ, "লকাডাউন নিয়ে পুরোপুরি রাজনীতি করছে তৃণমূল। বিজেপি সাংসদদের বাড়ির সামনে পুলিশ  দেওয়া হচ্ছে। বাইরে যেতে গেলেই বাধা দিচ্ছে। অথচ নিজে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেরিয়েছেন মুখ্য়মন্ত্রী। এখন তাঁর দলের  নেতারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তার দলের বিধায়ক, সাংসদরা ভিড় করে ত্রাণ বিতরণ করছেন। যে ঘটনা সোনারপুরে ঘটেছে, তা খুবই ভয়ঙ্কর ঘটনা। এইডস আক্রান্তদের অবশ্য়ই পরিচয় গোপন থাকা উচিত। এইসব শিশুদের অন্যান্য  সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি থাকে। সাংসদের কী দরকার ছিল এরকম একটা সময়ে সর্বসমক্ষে অনুষ্ঠান করার। সারা দেশ যখন করোনার সঙ্গে লড়াই করছে, তখন এরা রাজনীতি করতে ব্যস্ত।"

সোনারপুরের হোমকাণ্ড বলছে, এইচআইভি আক্রান্তদের ছবি ফেসবুকে ফলাও করে পোস্ট করেছেন বারুইপুরের এসপি। করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুসারে কোনওভাবেই এইচআইভি পজিটিভদের পরিচয়, এমনকী ফেসিয়াল রেকগনিশনও পাবলিকলি প্রচার করা যায় না। এক্ষেত্রে এমন দায়িত্ব জ্ঞানহীন কাজ কীভাবে সংঘটিত হল? এর কোনও সদুত্তর পাওয়া যায়নি। তবে, এই ঘটনায় মূলত তিনটি দিকে আঙুল উঠেছে- যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ মিমি চক্রবর্তী, বারুইপুরের এসপি রশিদ মুনির খান এবং অবশ্যই শিশু-রা যে হোমে থাকে তার প্রধান কল্লোল ঘোষ-এর দিকে। 

যদিও, কল্লোল ঘোষ যাবতীয় অভিযোগই অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, লকডাউনের পুরো নিয়ম এবং সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং-এর নিয়ম মানা হয়েছিল। তাহলে যে ছবি এবং ভিডিও এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হাতে এসেছে সেখানে কোথাও সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং মানার ছবি ধরা পড়েনি। উল্টে দেখা গিয়েছে অধিকাংশ ছবিতেই শিশুদের মুখে মাস্ক বা গ্লাভস নেই। তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন খোদ বারুইপুর জেলার এসপি রশিদ মুনির খান এবং তাঁর দলবল। এমনকী এই ভিড়ের মধ্যে ছিলেন সাংসদ মিমি চক্রবর্তীর প্রতিনিধিরাও। এনজিও-র প্রধান কল্লোল ঘোষ আবার জানেন না যে তাঁর হোমের শিশুদের ছবি ফেসবুকে পোস্ট হয়ে যাওয়ার কথা। এইআইভি আক্রান্ত শিশুদের ছবি কীভাবে পাবলিকলি পোস্ট করে দেওয়া হল- তার কোনও উত্তর তিনি দিতে পারেননি। 

পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে মঙ্গলবার দুপুরে সোনারপুরের এই হোমে একটি অনুষ্ঠান রাখা হয়। যেখানে এইআইভি পজিটিভ শিশুদের জন্য নানাধরনের উপহার নিয়ে হাজির হন রশিদ মুনির খান। যিনি বারুইপুর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার। তাঁর সঙ্গে তাঁর অধস্তন অফিসাররাও ছিলেন। ছিলেন সোনারপুর থানার আইসি-ও। এদিকে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ মিমি চক্রবর্তীর-ও সেখানে হাজির হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, লকডাউনের কথা ভেবে তিনি শেষমুহূর্তে সেখানে যাওয়া বাতিল করেন। পরিবর্তে তিনি তাঁর আপ্ত-সহায়ক অনির্বাণ ভট্টাচার্য-কে সেখানে পাঠান শিশুদের জন্য পোশাক নিয়ে। এই অনুষ্ঠানের জন্য মিমি আবার ভিডিও শ্যুট-ও করেও হোম কর্তৃপক্ষকে পাঠান। আবার পুরো অনুষ্ঠানকে স্মরণীয় করে রাখতে মিডিয়া, ক্যামেরাম্যান সবাইকে ডাকা হয়। একদল মানুষ মুহূর্তের মধ্যে সেই হোমের মধ্যে ঢুকে পুরো অনুষ্ঠানকে ক্যামেরাবন্দি করে রাখে। এই পরিস্থিতি-র মধ্যেই এইচআইভি শিশুরা ঘোরাফেরা করে। বলতে গেলে হোমের ভিতরে এক মেলা বসে যায়।

করোনাভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে একসঙ্গে যে কোনও জমায়েতের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাখা হয়েছে। এমনকী, বুধবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে লকডাউন-২-এর যে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে তাতেও যে কোনও ধরনের জমায়েতের উপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রাখার কথা বলা হয়েছে। অথচ, একজন দায়িত্ববান জনপ্রতিনিধি হিসাবে সাংসদ মিমি চক্রবর্তী এবং একজন দায়িত্ববান পুলিশ অফিসার হিসাবে রশিদ মুনির খান কীভাবে এই বিষয়গুলি ভুলে গেলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকী, হোমের প্রধান কল্লোল ঘোষ-ও বা কীকরে এমন এক জটিল পরিস্থিতি এতগুলো শিশুকে একদল বহিরাগত যারা হোমের ভিতরে সঠিকভাবে স্যানিটাইজেশন প্রবেশ করেছিল তাদের সামনে বের করেছেন- তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। 

এমনকী, অভিনেত্রী তথা সাংসদ মিমি চক্রবর্তী আসতে পারেন শুনে আশপাশের এলাকা থেকেও অসংখ্য মানুষ হোমের সামনে ভিড় করেছিলেন। খোদ হোমের প্রধান কল্লোল ঘোষ জানিয়েছেন, ভিড়় দেখে কোলাপসেবল গেটের একটা অংশ খুলে সেখান দিয়ে এসপি এবং সাংসদের প্রতিনিধিদের ভিতরে প্রবেশ করানো হয়েছিল। এমন এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি- তাও আবার তার সাক্ষী খোদ পুলিশ সুপার! স্বভাবতই পুরো ঘটনাকেই একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে দায়িত্ব-জ্ঞানহীনতা-র বলে দাবি করা হচ্ছে। নাম ও পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি আধিকারিকও জানিয়েছেন, কোনওভাবেই এইআইভি পজিটিভদের পরিচয়-কে পাবলিকলি প্রকাশ করা যায় না। এক্ষেত্রে আর এটা করা যায় না কারণ এরা সকলেই নাবালক।