পরিবারে দু’জন খোকন, একজন বড়, অন্যজন ছোট। ঘরের ছোট খোকন একদিন বাইরে হয়ে গেলেন ছোড়দা। সেই ছোড়দা সম্বোধনটাই একদা আমাহার্স স্ট্রিট-শিয়ালদা এলাকার দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা সৌমেন মিত্রের অনুগামীরা ছড়িয়ে দিলেন সর্বত্র।  
গেল শতকের ৬৭ তে রাজনীতিতে হাতেখড়ি ছোড়দার। দু’বছর পর প্রথম নির্বাচন- পুরভোট। তখন তিনি এলাকার ছোড়দা। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে এমএসসি পড়ছেন। পুরভোটে দাঁড়ানোর মতো কংগ্রেসের কোনও প্রার্থী নেই। ছোড়দাকেই দল প্রার্থী করল।  
তাঁর কথায় চলেছে মধ্য কলকাতা। কলকাতায় নকশাল আন্দোলনের সময় বোমাবাজি, খুনখারাপি লেগেই থাকত। ওই সময়েই রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৭৭-এর ভোটে বিপর্যয়ের পরেও কংগ্রেসকেই আঁকড়ে ধরে থাকেন। 
সাতের দশকে সিপিএম এবং নকশালের সঙ্গে লড়াই হত। বহু আদর্শবাদী সিপিএম,নকশালরা তাঁর বন্ধু ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতেন তাদের সঙ্গে। শৈবাল মিত্রের মতো নকশাল নেতাদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল তাঁর বাড়িতে। দেশব্রতী-র সম্পাদক সরোজ দত্ত তাঁর বাড়ির একটি ঘরে বসে দেশব্রতী সম্পাদনার কাজ করতেন। 
একসময় ছোড়দার আমহার্স্ট স্ট্রিট পেট্রোলপাম্পের ওপারে যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। খুনের হুমকি ছিল। অন্যদিকে নকশালদেরও সেন্ট পল্‌সের দিকে আসা বিপজ্জনক ছিল। এদিক সেদিক হওয়ায় দু’তরফেই বহু লাশ পড়েছে। 
টানা ৫ দশকের রাজনৈতিক জীবনে বহুবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু সেভাবে কি প্রশাসনিক ক্ষমতা কোনওদিন পেয়েছেন। তবে তাঁকে বেশিদিন সাংগঠনিক ক্ষমতা থেকে দূরেও রাখতে পারেনি দল। 
বরকত গণিখান চৌধুরির অত্যন্ত স্নেহের পাত্র ছিলেন তিনি। ১৯৭২ থেকে ২০০০৬ সালের মধ্যে সাতবার শিয়ালদহ কেন্দ্রের বিধায়ক হয়েছেন ছোড়দা। তবে বিধায়ক হওয়ার পরও বিধানসভার থেকে সাংগঠনিক কাজেই বেশি দেখা যেত তাঁকে। একটা সময় বাংলার প্রতিটি বুথের কংগ্রেস কর্মীদের নাম ধরে চিনতেন তিনি।
একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সোমেন মিত্র কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এ রাজ্যে কংগ্রেস রাজনীতি করতেন।  কথিত সোমেন মিত্রের জন্যই নাকি মমতা কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলের জন্ম দেন। মমতা কংগ্রেস ছাড়ার সময় সোমেন মিত্র প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। সভাপতি নির্বাচনের ভোটে মমতাকে নাকি হারিয়ে দিয়েছিলেন সোমেন মিত্র। 

এরপর সেই সোমেন মিত্রকেই তৃণমূলে টেনে সবচেয়ে বড় চমক দেন তৃণমূল সুপ্রিমো। যদিও সেই সম্পর্কও টেকেনি বেশি দিন। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূলের সাংসদ পদে ইস্তফা দেন সোমেন।
তখন কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যাওয়ার লোকই বেশি ছিল। অথচ সোমেন মিত্র হাঁটলেন উল্টো পথে। জানা যায়, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির সঙ্গে মতবিরোধের কারণে কংগ্রেস ছেড়েছিলেন। তৈরি করেছিলেন প্রগতিশীল ইন্দিরা কংগ্রেস।
সেই দল কার্যত ছিল খাতায় কলমে। ২০০৯ এর লোকসভা ভোটে প্রগতিশীল ইন্দিরা কংগ্রেস তৃণমূলে মিশে যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে থেকেও নিজের সত্তা বজায় রেখেই সোমেন মিত্র কাজ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বছর দু-তিনের মধ্যেই সংঘাত, ফের কংগ্রেসে ফেরা।
তবে এটাও ঘটনা ২০০৮ সালে সিঙ্গুর আন্দোলন ঘিরে পরিবর্তনের হাওয়ায় যখন বাংলার রাজনীতি  উত্তাল। সিঙ্গুরে বাম সরকারের শিল্পায়ন নীতির বিরুদ্ধে ধর্মতলায় ধরনায় বসেছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার পাশে ছোট্ট একটা মঞ্চে ধরনায় বসতে দেখা যেত ছোড়দাকে। 
সোমেন মিত্র তখনও কিন্তু তৃণমূলে যোগ দেননি। তখন তিনি প্রগতিশীল ইন্দিরা কংগ্রেসের নেতা। ধর্মতলার সেই ধরনামঞ্চে তখন সারা বাংলার কংগ্রেস-তৃণমূল কর্মীরা আসতেন। অনেকেই সোমেন মিত্র-র সঙ্গে আলোচনা করতেন। 
হয়ত তখনই মমতার সঙ্গে থেকে কাজ করার কথা ভেবে ফেলেছিলেন। পরে তৃণমূলে যোগ দেন তিনি। তবে মমতাকে সামনে রেখে নেপথ্য নায়কের ভূমিকা নিতেই সচ্ছন্দ্য ছিলেন সোমেন মিত্র। যদিও বেশিদিন টিকতে পারেননি। 
মমতা যখন ক্ষমতার মধ্যগগনে, তখন স্রোতের বিপরীতে গিয়ে তৃণমূল ছাড়েন সোমেন মিত্র। একেবারে রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই সাংগঠনিক কাজ এবং সাংগঠনিক ক্ষমতা  পছন্দ করতেন সোমেন। 
রাজ্যজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েও প্রদেশ সভাপতির নির্বাচনে সোমেনের কাছে হেরে যান মমতা। মমতা আজ রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। কিন্তু সোমেনকে প্রশাসনিক ক্ষমতা ততটা টানত না। তাঁকে টানত সাংগঠনিক ক্ষমতা। 
সেজন্যই ১৯৯৮ সালে প্রদেশ সভাপতির পদ ছাড়ার পর কংগ্রেস কার্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করেছিলেন। বিধানভবনে ফিরেছিলেন ২০১৮ সালে ফের প্রদেশ সভাপতি হওয়ার পর। আর রাজ্যে দলের সাংগঠনিক শীর্ষপদে থাকাকলীনই বিদায় নিলেন।