নারদকাণ্ডে গ্রেফতারি ও পরে জামিনে নাটকীয় মোড়। রাতের মধ্যেই ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মদন মিত্র এবং শোভন চট্টোপাধ্যায়ের জামিনে স্থগিতাদেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। যার ফলে, সন্ধ্যায় যে জামিন অনিবার্য বলে মনে হচ্ছিল তাতে রীতমতো বাধা তৈরি হয়ে গেল। কলকাতা  হাইকোর্টের যা নির্দেশ তাতে ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মদন মিত্র এবং শোভন চট্টোপাধ্যায়দের বুধবার পর্যন্ত জেলেই থাকতে হবে। 

 


ইতিমধ্যেই এই স্থগিতাদেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফিরহাদ হাকিমের কন্যা এবং সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী। ফিরহাদ কন্যার অভিযোগ, সন্ধ্যায় ব্যাঙ্কশাল কোর্ট থেকে জামিনের অনুমতি পাশ হতেই তাঁরা সিবিআই-এর কাছে অর্ডার কপি চেয়েছিলেন। কিন্তু, সিবিআই কর্তৃপক্ষ সেই অর্ডার কপি দিতে অস্বীকার করে। ফিরহাদ হাকিমের কন্যার অভিযোগ তাঁর সামনেই সিবিআই-এর অফিসার বলতে থাকেন দিল্লি থেকে ফোন আসছে। এই মুহূর্তে অর্ডার কপি দেওয়া যাবে না। অর্ডার কপি নিয়ে এমন টালবাহানা রাত পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন ফিরহাদ হাকিমের কন্যা। অন্যদিকে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী পুরো ঘটনায় নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ-কে নিশানা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, যেভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জামিন নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করেছে সিবিআই- তা তীব্রভাষায় নিন্দিত হওয়া উচিত। 

 

সোমবার সন্ধ্যায় জামিন হওয়ার পরই কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করে সিবিআই। ব্যাঙ্কশাল কোর্টের দেওয়া জামিনের নির্দেশে স্থগিতাদেশ চায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। কলকাতা হাইকোর্ট এরপর নিম্ম আদালতের নির্দেশে স্থগিতাদেশ দিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে হাইকোর্ট জানিয়ে দেয় এই মামলার পরবর্তী শুনানি বুধবার। ফলে, বুধবার পর্যন্ত জেলে থাকাটা অনিবার্য হয়ে পড়ল ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মদন মিত্র এবং শোভন চট্টোপাধ্যায়ের। 

 

তৃণমূল কংগ্রেসের দুই মন্ত্রী এবং এক বিধায়ক ও প্রাক্তন বিজেপি নেতা শোভন চট্টোপাধ্যায়ের জামিন যে হচ্ছে না তা রাত নটার মধ্যেই পরিস্কার হয়ে যায়। এরপরই চার হেভিওয়েট নেতাকে জেলে রাখার তোড়জোড় শুরু করে সিবিআই। প্রেসিডেন্সি জেলে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। জেলের উচ্চ-পদস্থ কর্তারা চলে আসেন। যে ওয়ার্ডে রাজ্যের দুই মন্ত্রী এবং এক বিধায়ক ও শোভনকে রাখা হবে সেই ওয়ার্ডগুলোকে পরিস্কার করে সাজানোর তোড়জোড় শুরু করে দেয় প্রেসিডেন্সি জেল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু, রাতের মধ্যে ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মদন মিত্র এবং শোভন চট্টোপাধ্যায়কে জেলে নিয়ে যাওয়া হবে কি না তা নিয়ে একটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়। 

এদিকে নিজাম প্যালেসে রাত ১১টা নাগাদ পৌঁছয় একটি মেডিক্যাল টিম। চার নেতার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে দেখা হয়। সোমবার সকালে চার নেতাকে নিজাম প্যালেসে আনা হয়েছিল। সেই সময় থেকেই তাঁদের নিজাম প্যালেসে একটি ঘরের মধ্যে আটকে রেখেছিল সিবিআই। দীর্ঘসময় ধরে একটি ছোট ঘরে আটকে থাকায় কিছু শারীরিক অস্বস্তির সমস্যা নিয়ে চার নেতাই সিবিআই অফিসারদের অবগত করেন। রাত ১১.৩০টায় সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী খাবার নিয়ে নিজাম প্যালেসে পৌঁছন। তিনি সিবিআই অফিসারদের জানান, সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের শারীরিক অসুস্থতা এই সময়ে চরমে রয়েছে। বাইরের খাবার গ্রহণে এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে। তাই তিনি বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে এসেছেন। 

 

চার নেতার জামিনে স্থগিতাদেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট এবং তাঁদের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে- এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই কাতারে কাতারে তৃণমূল কর্মী ও সমর্থক নিজাম প্যালেসের সামনে চলে আসে। নতুন করে ফের অবস্থান বিক্ষোভ শুরু হয়। তবে, এই অবস্থানে যে তাঁদের তিন নেতার অসুবিধা যে আরও বাড়বে তা কর্মী-সমর্থকদের বোঝান তৃণমূল নেতারা। কোনও ধরনের ঝামেলা-গণ্ডগোলে সিবিআই এবং বিজেপি ফায়দা তুলতে পারে বলেও দলের কর্মী সমর্থকদের বোঝান তৃণমূল নেতারা। এমনকী, ফিরহাদ হাকিমের মেয়ে প্রিয়দর্শিনীও তৃণমূল কর্মী ও সমর্থকদের শান্ত থাকতে এবং কোনও ধরনের প্ররোচনামূলক উস্কানিতে ধৈর্যচ্যূতি না ঘটার আর্জি রাখেন।

বিজেপি নেতা জয়প্রকাশ মজুমদার দাবি করেন যে নারদকাণ্ডের মামলা অন্য রাজ্যে সরিয়ে নেওয়ার আবেদন রাখতেই পারে সিবিআই। এতে অন্যায় কিছু নেই। পুরো পরিস্থিতির জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে আহুল তোলেন। তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতির অভিযোগ উড়িয়ে দেন। উল্টে তিনি বলেন, এখানে বিজেপি বা নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহরা কেউ নন। সিবিআই আইনানুগ পথেই পদক্ষেপ নিয়েছে। জামিন নাকচে বিস্ময় প্রকাশ করেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অভিযোগ করেন, অভিযুক্তদের পক্ষের আইনজীবী ছাড়াই কীভাবে বুধবার পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্ট জামিনে স্থগিতাদেশ দিল। তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষও জামিনে স্থগিতাদেশে বিস্ময় প্রকাশ করেন।