পুরাণ অনুযায়ী, সূর্য এদিন তার নিজের ছেলেকে নিয়ে মকর রাশি অধিপতি শনির  বাড়ি ঘুরতে গিয়েছিলেন এক মাসের জন্য়। তাই এই দিনটিকে বাবা ও ছেলের সম্পর্কের একটি বিশেষ দিন হিসেবে ধরা হয়। পুরাণ আরও বলে, এই দিনেই দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ শেষ হয়। বিষ্ণু নাকি অসুরদের বধ করে তাদের কাটা মুণ্ডু মন্দিরা পর্বতে পুঁতে দিয়েছিলেন। তাই এইদিন অশুভ শক্তির বিনাশ হয়ে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা হয় বলে মনে করা হয় পুরাণে। শোনা যায় এই মকর সংক্রান্তিতেই নাকি পিতামহ ভীষ্ম শরশয্য়ায় ইচ্ছামৃত্য়ু ঘোষণা করেন।

এবার পুরাণ থেকে ইতিহাসে আসা যাক। কৃষি আর ফসল উৎপাদনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে মকর সংক্রান্তির।  এটি মূলত কৃষিপ্রধান উৎসব। এই পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি শুধু বাংলাতেই নয়, দেশের নানা জায়গায় পালিত হয়। সেইসঙ্গে পালিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। এক-এক জায়গায় এর এক-একরকম বৈশিষ্ট্য। সব জায়গায় উৎসবের মেয়াদও এক নয়। কোথাও চারদিন ধরে চলে তো কোথাও বা একদিন।

ভূগোলে আমরা পড়েছি সূর্যের  গতি দু-রকমের হয়। উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন। ২১ ডিসেম্বর সূর্য উত্তরায়ণ থেকে দক্ষিণায়ণে  প্রবেশ করে। তাই এদিন রাত সব থেকে বড় হয় আর দিন সব থেকে ছোট হয়। এর পর থেকেই উল্টোটা হতে শুরু করে। অর্থাৎ দিন বড় হয় আর রাত ছোট হয়।

আমরা এই  উৎসবকে বলি পৌষ সংক্রান্তি। এই রাজ্য়ের বিভিন্ন জেলায় পালিত হয়  এই উৎসব। পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় পালিত হয় টুসু উৎসব। টুসু অবশ্য় পালিত হয় ওড়িশাতেও। আমাদের এখানে এই সময়ে হয় গঙ্গাসাগর মেলা। কেঁদুলির জয়দেব মেলাও এরই আশপাশে অনুষ্ঠিত হয়। এলাহাবাদের কুম্ভমেলাও অনুষ্ঠিত হয় এই মকর সংক্রান্তির সময়ে। দু-জায়গাতেই ভোরবেলায় পুণ্য়স্নান করেন অসংখ্য় পুণ্য়ার্থী। লক্ষ্মীর আরাধনাও করা হয় এই সময়ে।

এই সময়ে বাংলার ঘরে-ঘরে তৈরি হয় পাটিসাপটা, পুলিপিঠে। দক্ষিণ ভারতে এই সময়ে হয় পোঙ্গল উৎসব। সেখানে আখ ও তিলের মিষ্টি তৈরি  হয়। পাঞ্চাবের লোহ্রির মতোই তামিলরা প্রথম দিন কাঠকুটো জড় করে আগুন জ্বালান। সেই আগুনে আহুতি দেওয়া হয় পুরনো পোশাক থেকে শুরু করে জিনিসপত্র।

ভারতের বাইরেও এই উৎসব পালন করা হয়। নেপালে এর নাম মাঘি ( মাঘ শব্দ থেকে)। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য় দেশগুলির মধ্য়ে তাইল্যান্ডে এই উৎসব পালিত হয়। সেখানে এর নাম সংক্রান (সংক্রান্তি থেকে)।  শুনলে অবাক হতে হয়, সুদূর লাওস-ও বাদ যায় না এর থেকে। সেখানে এই উৎসবের নাম থিং-ইয়ান। আর  পল পটের কম্বোডিয়ায় একে বলা হয় মহাসংক্রান।

আমাদের দেশের নানা প্রান্তে পালন করা হয় এই সংক্রান্তির উৎসব। এই সময়ে সূর্যের উত্তরায়ণ হয়। গুজরাতে তাই এই উৎসবকে বলা হয় উত্তরায়ণ। অসমে বলা হয় ভোগালি বিহু, পাঞ্চাব আর হরিয়ানায় মকর সংক্রমণ। কাশ্মীরেও পালিত হয় এই মকর সংক্রান্তি। সেখানে এর নাম শায়েন-ক্রাত। ঝাড়খণ্ড, বিহার, মধ্য়প্রদেশ, ছত্তিশগড় ও উত্তরপ্রদেশের মানুষও এই সংক্রান্তি পালন করেন। সেখানে এই উৎসবের নাম ভারি অদ্ভুত-- খিচড়ি পর্ব বা সকরত।