খেলা আসে খেলা যায়। আর তারই ফাঁকে ফিকে হয় সাউথ সিঁথির যুবক উমাকান্তের স্মৃতি। ১৯৭৫ সালের ২৯সেপ্টেম্বর। প্রিয় দল মোহনবাগান কিনা ইস্টবেঙ্গলের কাছে পাঁচ-শূন্য়ে হেরেছে! এ-ও কি মেনে নেওয়া যায়। সেদিন ম্য়াচ শেষ হওয়ার বাইরে বেরিয়ে এসে অঝোরে কেঁদেছিলেন মোহনবাগান সমর্থক উমাকান্ত পালধি। তারপর বাড়ি ফিরে কীটনাশক খেয়ে আত্মঘাতী হয়েছিলেন। আর তারও পর, কালের সংক্ষিপ্ত নিয়মে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছিলেন। আজ এই প্রজন্মের বাগান সমর্থকদের আশি শতাংশই শোনেননি উমাকান্তের নাম।

 

আজকে মিডিয়া অধ্য়ুষ্য়িত মধ্য়বিত্ত জীবনে উমাকান্তের মতো কেউ যদি প্রিয় দল হেরে যাওয়ায় বিষ থেয়ে মরতেন, তাহলে কত শত সহস্র লাইভ টেলিকাস্ট যে হত, উমাকান্তের বাড়ির সামনে ক-টা ওবি ভ্য়ান যে গিয়ে পড়ে রইত, তা আর বলার দরকার হয় না। নিদেন পক্ষে দেখনদারির জন্য় হলেও ক্লাব কর্তারা মাঝেমধ্য়েই যেতেন সেই বাড়িতে। হয়তো বা শিবপ্রসাদ-সৃজিতরা একটা আস্ত বায়োপিকই বানিয়ে ফেলতেন উমাকান্তের ওপর। কিন্তু  সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এমন মিডিয়া বিস্ফোরণ হয়নি। উমাকান্তের ওপর বায়োপিক বানানোর কথা কল্পনাও করা যায়নি।

 

তবু কোথাও কোনওভাবে স্মৃতি রয়ে যায় আমাদের যূথবব্ধ বেঁচেবর্তে থাকার মধ্য়ে দিয়ে।  আজ থেকে ৪৫ বছর আগে, ১৯৭৫ সালে সাউথ সিঁথিতে নিজের বাড়িতে বিষ খেয়ে আত্মঘাতী হওয়ার আগে উমাকান্ত তাঁর সুইসাইড নোটে লিখে রেখেছিলেন, "পরের জন্মে আবার মোহনবাগান খেলোয়াড় হয়ে জন্মে প্রতিশোধ নিতে চাই এই হারের, লালহলুদের ডেরায় গিয়ে।"

 

বাংলার ফুটবলের ইতিহাসে এমন বৃহত্তম জয় বা পাঁচ-শূন্য়ের ইতিহাস আর কখনও রচিত হয়নি ময়দানে। আর কোনওদিন কোনও উমাকান্তকে এভাবে চোখের জলে আত্মঘাতী হতে হয়নি। যদিও আজ আর কেউ খোঁজ রাখে না এই উমাকান্ত কে ছিলেন, কেমন আছেন তাঁর বাড়ির লোকজন। তবু, ওই যে কিছু স্মৃতি রয়ে যায়। তার জন্য়ই কেউ কেউ মনে রাখে  উমাকান্তকে। তাই, কলকাতার ময়দানের এমন এক আত্মঘাতের ইতিহাসের রচনা করে যাওয়া মানুষটার স্মরণে এই প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন কম্বল বিতরণ করলো 'তোমার আমার মোহনহাগান' নামে একটি হোয়াটসঅ্য়াপ গোষ্ঠী। যার পৃষ্ঠপোষক অর্থোপেডিক ডা. সুমন্ত ঠাকুর বললেন, "দেখুন মোহনবাগান সমর্থক আমরা অনেকেই। কিন্তু ক-জন আর মনে রেখেছি ওই মানুষটাকে। আজকের বাগান সমর্থকদের প্রায় আশি শতাংশই জানেন না উমাকান্ত কে ছিলেন। তাই আর কিছু পারি -না-পারি, বছরে অন্তত একটা দিন ওই মানুষটাকে তো স্মরণ করতে পারি।" চালতাবাগান শ্রীরামকৃষ্ণ প্রেমবিহার প্রাঙ্গণে  ৫৫জন মানুষকে কম্বল দেওয়া হল।  প্রায় ৪০ জন রোগীকে নিখরচয়া দেখা হল।

 

তোমার আমার মোহনবাগানের তরুণ সদস্য়রা সামনের দিনে উমাকান্তকে স্মরণ করতে আরও কিছু কর্মসূচি নিয়েছেন।  সদস্য়দের মধ্য়ে রয়েছেন সুনন্দ ভৌমিক, সুকমোল দাস, অভিরূপ মল্লিক, সত্য়েন্দ বেরা, শুভদীপরা। এঁরা চাইছেন খেলাটাকে যেন সমর্থকরা খেলা হিসেবেই নেন। মাঠের লড়াই যেন মাঠেই থাকে। হারজিতকে যাতে হারজিত হিসেবেই নিতে পারি আমরা। কারণ, ১৯৭৫ সালের সেই দুঃস্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়়ায় অনেক সমর্থককে। সেদিন  খেলা শেষে মোহনবাগান মাঠের গাছে আগুন ধরিয়ে দেন সমর্থকরা। কয়েকহাজার সমর্থক চোখের জল ফেলতে-ফেলতে মাঠ ছাড়়েন। বেধড়ক লাঠিচার্জ করে পুলিশ। প্রসূন বন্দ্য়োপাধ্য়ায় ও সুব্রত ভট্টাচার্যকে রীতিমতো ব্য়ারিকেড করে বের করে আনে পুলিশ।