করোনার আতঙ্ক এবার গিলে ফেলল কলকাতা হাইকোর্টের কার্যপ্রক্রিয়াকেও। যার জেরে ৩০ এপ্রিল থেকে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে রাজ্যের শীর্ষ আদালতের কাজকর্ম। এমনকী, মে মাসের ৪ মে থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে যে চারটি দিন কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর শুনানি হওয়ার কথা ছিল তাও স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। এই মর্মে বুধবার একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেন কলকাতা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল রাই চট্টোপাধ্যায়। বিশ্বস্ত সূত্রে খবর করোনাভাইরাসের জেরে এবার আপতকালীন পরিস্থিতিতে কলকাতা হাইকোর্টকে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি টি বি রাধাকৃষ্ণণ। 

জানা গিয়েছে, লকডাউনের এই বাজারে আলিপুর আদালতে একটি গাড়িতে অফিসারদের আনা-নেওয়ার কাজ চলছিল। যে গাড়িতে এই কাজ হচ্ছিল সেই গাড়ির চালকের মা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এই মুহূর্তে সল্টলেকের আমরি হাসপাতালে সেই চালকের মা-এর চিকিৎসা চলছে। ওই চালক আদালতের গাড়িতেই মা-কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কাজ করেছিলেন। এরপরও তিনি সেই গাড়িতেই আলিপুর আদালতের একাধিক অফিসার-কে আনা নেওয়ার কাজ করেন। এমনকী, সেই একই গাড়িতেই তিনি কলকাতা হাইকোর্টের অফিসারদেরও আনা-নেওয়ার কাজ করেন। বিষয়টি ২৮ এপ্রিল আলিপুর আদালতের নজরে আসে। এরপরই বিশেষ অর্ডার বের করে ২৯ এপ্রিল থেকে আলিপুর আদালত বন্ধ করে দেওয়া হয়। এবং আলিপুর আদালতের যে সব অফিসার ও কর্মী করোনা পজিটিভ রোগীবাহী গাড়িতে যাতায়াত করেছিলেন তাদের কোয়ারান্টাইনে যাওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়। 

২৯ এপ্রিল বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টের নজরে আসে। কারণ ওই একই গাড়িতেই কলকাতা হাইকোর্টের অসংখ্য অফিসার যাতায়াত করেছেন। এরপর বুধবার বিকেলে বৈঠকে বসেন প্রধানবিচারপতি টি বি রাধাকৃষ্ণণ। সেখানেই নিয়ে কথা বলে কলকাতা হাইকোর্টকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ আইসিএমআর-এর নির্দেশ অনুযায়ী করোনাপজিটিভ রোগীর সরাসরি ও ইনডিরেক্ট কনট্যাক্টে আসাদের অন্তত ১৪ দিনের কোয়ারান্টাইনে থাকতে হবে। ওই গাড়িতে যাতায়াতকারী অফিসাররা আবার বিভিন্ন স্থানে বহুজনের সংস্পর্শে এসেছেন। তাই এহেন পরিস্থিতিতে আদালত বন্ধ করা ছাড়া কোনও  রাস্তা খোলা ছিল না। 

লকডাউন চললেও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কাজ চলছিল। এরই মধ্যে বসেছে স্পেশাল আদালতও। মঙ্গলবার কলকাতা হাইকোর্টে স্পেশাল আদালত উপলক্ষে অন্তত ৩০০ জনের ভিড় হয়। পুলিশ থেকে শুরু করে আইনজীবী, বিচারপতি এবং অফিসার মিলিয়ে এমন-ই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছিল। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং-ও ঠিক করে পালন করা যায়নি। লকডাউনে এমন এক ভিড় দেখে কলকাতা হাইকোর্টের অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। করোনার এমন আতঙ্কে এই নিয়ে বেশ কথা চালাচালিও হয়। সেই ঘটনার রেশ মেলাতে না মেলাতেই আলিপুর আদালত-এর গাড়ি এবং তার চালকের বিষয়টি সামনে আসে। এতে কলকাতা হাইকোর্টেও আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। এই আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয় যখন আলিপুর আদালতের সমস্ত এজলাসই বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্পেশাল বেঞ্চ ছাড়া আলিপুর আদালতে কোনও এজলাসে আপাতত কাজ হবে না। ঠিক একইরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টেও। করোনার গ্রাসে কলকাতা ও রাজ্যের দুই গুরুত্বপূর্ণ আদালতে তালা ঝোলায় স্বাভাবিকভাবেই বহু মামলার কাজ ঝুলে গেল। বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টে দমকল বাহিনীও আসে। তারা গোটা বিল্ডিং-কে স্যানিটাইজ করে। কিন্তু, এতসত্ত্বেও হাইকোর্টের কর্মী ও অফিসারদের মন থেকে আতঙ্ক মোছা যাচ্ছে না। এই আতঙ্ক আরও বেড়ে গিয়েছে একের পর এক কমিউনিটি ট্রান্সফিউশনের কেস ধরা পড়ায়।