বাবা দোকানদার, ছেলেকে পড়াশোনা করানোর ক্ষমতা একেবারেই নেই।  তার ওপর বড় ভাই পরীক্ষায় খুব খারাপ ফলাফল করায়  বাবা ডাক্তারের সিদ্ধান্ত নেন  ছেলেদের পড়াশোনা বাদ দিয়ে দোকানের কাজে লাগিয়ে দেবেন। কিন্তু ছেলেটি পড়াশোনা করতে চায়। কাঁদতে কাঁদতে ছেলেটি পাড়ার ডাক্তার কাকার কাছে গিয়ে হাজির হয়। তিনি ছেলেটিকে  স্নেহ করতেন। তার পড়াশোনার আগ্রহের কথা জানতে পেরে তিনি তাকে সাহায্য করতে রাজি হন। তবে শর্ত, ডাক্তারখানার টুকটাক কাজ করার বিনিময়ে তিনি পড়াশোনার খরচ বহন করবেন। 
শুধু ডাক্তারখানা নয়, বাড়ির গোয়ালঘর দেখাশোনা, বাসন মাজার মতো কাজ করতে হত ছেলেটিকে। তবেই জুটত খাবার, মাথা গোঁজার ঠাঁই।যদিও কাজগুলো মনের আনন্দেই করত সে। কারণ, তার বদলে মিলত পড়াশোনার সুযোগ। কিন্তু সেই ডাক্তারের বাড়িতে ছিল জাতপাত নিয়ে চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি। সে যে ‘নিচু জাত’-এর ছেলে। তাই বাড়ির অন্দরমহলে ঢোকা বারণ। তাছাড়া নির্দেশ ছিল, নিজের বাসনপত্র পুকুর থেকে নিজেকেই ধুয়ে মেজে আনতে হবে। বাড়ির বাসনের সঙ্গে মিশিয়ে ফেললেই কেলেঙ্কারি।কিন্তু পড়াশোনার জন্য ছেলেটি সব মুখ বুজে মেনে নেয়। 
মন দিয়ে লেখাপড়ার স্বীকৃতিস্বরূপ ছেলেটি সরকারি কলেজিয়েট স্কুলে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ পেল। কিন্তু সময়টা বাংলাদেশের পক্ষে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে তখন গোটা বাংলা তোলপাড়। ছেলেটি সেই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়, বিনা বেতনে পড়ার সুযোগও হাতছাড়া হয়। তবে বড় ভাইয়ের সাহায্যে অন্য স্কুলে ভরতি হয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম এবং গণিতে তৃতীয় স্থান অধিকার করল। নিজের ভালো ফলাফলে উৎসাহিত ছেলেটি কলকাতায় পড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে ভরতি হয়েও নিজের বর্ণগত পরিচয়ের কারণে এখানে সে বেশ অসুবিধায় পড়ল। দুপুরবেলায় প্রেসিডেন্সি কলেজের ইডেন হিন্দু হোস্টেলের খেতে ক্লান্ত তরুণটি যখন পেছনের টেবিলে গিয়ে বসল ঠিক তখনই ঘটলো বিপত্তি। একে একে অন্য ছাত্ররা ভোজনশালার দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। কোনো ছাত্র এই নতুন তরুণের সঙ্গে বসে খেতে রাজি নয়। তরুণটির বুঝতে বেশি সময় লাগল না। তাঁর সেই সময়কার দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বর্ণবাদের শেকড় যে মাটির কত গভীরে চলে গিয়েছে তা তরুণটি খুব ভাল করেই বুঝতে পারল। 
সেদিনের হোস্টেলের নতুন ছাত্রটি যে বর্ণে শূদ্র। সমাজের সবচেয়ে নিচু স্তরের মানুষ। তাই নিজের ধর্ম, জাত রক্ষার দোহাই দিয়ে সেদিন হোস্টেলের ছেলেরা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ওই বৈষম্য কেবল খাবার ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কিছুদিন পর দেখা গেল, ব্রাহ্মণ ছাত্ররা তাকে সরস্বতীর পুজোতে অংশ নিতেও নিষেধ করল। সেদিন তরুণ ছাত্রটি পরাজিত সৈনিকের মতো একা একা নিজের ঘরে বন্দি থেকে বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছিল। কিন্তু সেদিনের প্রেসিডেন্সি কলেজের কোনো উচ্চবর্ণের ছাত্র ভুলেও কল্পনা করতে পারেনি, ওই শূদ্র তরুন ছাত্র একদিন তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে অনেক উঁচুতে উঠে যাবে। এতক্ষণ যে শুদ্র তরুণের কথা বলা হল তিনি বাংলার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহা।
মেঘনাদ সাহার বড় ছেলে অজিত সাহা জানিয়েছিলেন, যে দিন তাঁর বাবা জন্মেছিলেন, সারা দিন ধরেই ছিল প্রচণ্ড ঝড়-জলের তাণ্ডব। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী ঝড়-জলের দেবতা মেঘরাজ ইন্দ্র। তাই দেবরাজ ইন্দ্রের নামানুসারে নবাগত শিশুর নাম রাখা হয়েছিল মেঘনাথ। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দুদের বৈদিক ধর্মীয় আচরণের গোঁড়ামি মেঘনাথকে এতটাই বিরক্ত করে তুলেছিল যে, তিনি নিজের নাম পাল্টে রেখেছিলেন মেঘনাদ। যিনি ইন্দ্রজিৎ। দেবতা নন, রাক্ষসদের প্রতিনিধি। সেই থেকে গোটা বিশ্বের কাছে তিনি মেঘনাদ নামে পরিচিত হন। তাঁর চোখে মেঘনাদ ইন্দ্রজিৎ সমাজের অপমানিত অংশের প্রতিনিধি, যাঁকে অন্যায় ভাবে বধ করেছিল ব্রাহ্মণ সমর্থিত এক ক্ষত্রিয় রাজপুত্র। শুধু বিজ্ঞান বা রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, নিজের নাম বদলেও মেঘনাদ প্রমাণ করেছিলেন তিনি আসলে ডেমোক্র্যাটিক ক্লাসের প্রতিনিধি, যাদের পিছিয়ে পড়া বলা হয়, জোর করে পিছিয়ে রাখা হয়।
জাতিভেদের বিরূদ্ধে আজীবন লড়াই করার বারুদ ভরা ছিল বিজ্ঞানী মেঘনাদের বুকে, যার ছাপ পড়েছিল তাঁর বিজ্ঞান গবেষণা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মতাদর্শে। সেই সঙ্গে গড়ে উঠেছিল বৈদিক ধর্মের প্রথা, প্রতিষ্ঠান এবং সেগুলিকে ব্যবহার করে হাজার হাজার বছর ধরে চলতে থাকা সামাজিক বিভেদের প্রতি বিদ্বেষ। সেই বিদ্বেষ এমনই জায়গায় পৌঁছেছিল যে তিনি পিতৃদত্ত নাম পর্যন্ত বদলে নিয়েছিলেন।