প্রথমজন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় এবং দ্বিতীয়জন বিধাননগরের বর্তমান মেয়র সব্যসাচী দত্ত। অথচ একসময় তাঁরাই ছিলেন তৃণমূল নেত্রীর অন্যতম ভরসার কারণ। 

কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবথেকে ঘনিষ্ঠ নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই মমতার অনুগামী ছিলেন শোভন। রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে তা পৌঁছিছিল পারিবারিক বৃত্তে। বাস্তবিকই মমতা শোভনের কাছে ছিলেন বড় দিদির মতোই। সেকথা প্রকাশ্যে একাধিকবার বলেওছেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র। তাই ২০১০ সালে তৃণমূল কলকাতা পুরসভা দখল করার পরে অনেক হেভিওয়েটকে টপকে স্নেহের কাননকেই মেয়রের চেয়ারে বসিয়েছিলেন মমতা। এর পরে শোভন বিধায়ক হয়েছেন, ২০১৬ সালে নির্বাচনে জিতে একাধিক দফতরের মন্ত্রিত্বও পেয়েছেন। মমতার প্রতি নিজের আনুগত্য প্রমাণে চেষ্টার কসুর রাখেননি শোভনও। কিন্তু বান্ধবী বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে মমতা, দলের প্রতি আনুগত্য বিসর্জন দিয়ে শোভন এখন তৃণমূলেরই চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছেন। শোভন যে কোনও দিন বিজেপি-তে যোগ দিতে পারেন, এমন আশঙ্কাতেই প্রমাদ গুণছেন দলের নেতারা। অভিমানী শোভনকে দলে ফেরাতে তৃণমূলের সর্বোচ্চ স্তর থেকে চেষ্টার কসুর করা হচ্ছে না। 

আরও পড়ুন- 'বৃষ্টি হলে ছাতা খুলব', তৃণমূলের বৈঠকে ডাক না পেয়ে হুঁশিয়ারি সব্যসাচীর

শোভনের মতো মমতার ঘনিষ্ঠ বৃত্তে না থাকলেও দলের সুনজরেই ছিলেন সব্যসাচী দত্তও। সব্যসাচী অবশ্য আগে বিধায়ক হন, পরে মেয়র। তৃণমূলে সব্যসাচী দত্তের উত্থান মুকুল রায়ের হাত ধরেই। কিন্তু মুকুলের সঙ্গে দলের দূরত্ব তৈরি হওয়ার পরে সব্যসাচীর উপরেই ভরসা রেখেছিল দল। তৃণমূলের হয়ে ত্রিপুরার দায়িত্বে ছিলেন মুকুল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ত্রিপুরায় কংগ্রেস ছেড়ে আসা তৃণমূল বিধায়করা দল বেঁধে বিজেপি-তে যোগ দেন। এর পরে মুকুলের জায়গায় সব্যসাচীকেই ত্রিপুরার দায়িত্ব দিয়েছিলেন মমতা। কিন্তু সব্যসাচী মমতার সেই ভরসার মর্যাদা কতটা রাখলেন, সেই প্রশ্ন এখন দলের মধ্যেই উঠতে শুরু করেছে। সব্যসাচীর বিজেপি-তে যোগদান নেহাতই সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করছেন তৃণমূল নেতাদের গরিষ্ঠ অংশ। বরং দল এখন চাইছে, সব্যসাচী নিজেই তৃণমূল ছাড়ুন।

শোভন অবশ্য এখনও সব্যসাচীর মতো প্রকাশ্যে দল বিরোধী কোনও কথা বলেননি। তিনি শেষ পর্যন্ত সত্যিই বিজেপি-তে যাবেন, এমন কথাও কিন্তু হলফ করে বলতে পারছেন না কেউই। কারণ একটাই, মমতার সঙ্গে শোভনের অতীতের সম্পর্ক। সেই কারণেই কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার আগে স্নেহের কাননকে অনেক সময় দিয়েছিলেন মমতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দল এবং বান্ধবীর মধ্যে দ্বিতীয় বিকল্পকেই বেছে নেন প্রাক্তন মেয়র। কিন্তু শোভনের জন্য দলের দরজা যে এখনও অবারিত দ্বার, তা ইতিমধ্যেইন বুঝিয়ে দিয়েছেন মমতা। সেই কারণেই শোভনকে ফেরাতে মমতার দূতও পৌঁছে গিয়েছেন তাঁর কাছে।  সব্যসাচীর ক্ষেত্রে কিন্তু এ কথা খাটে না। মুকুল ঘনিষ্ঠতা হোক বা খারাপ সময়ে দলবিরোধী মন্তব্য, সব্যসাচী এখন সত্যিই তৃণমূলের গলার কাঁটা হয়ে উঠেছেন।

আগামী বছর পুরসভা নির্বাচন। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে কলকাতা এবং বিধাননগর পুরসভার ভোট রীতিমতো প্রেস্টিজ ফাইট তৃণমূল নেতৃত্বের কাছে। দলের নেতারা অনেকেই মনে করছেন, সব্যসাচী বিজেপি-তে যোগ দিলে হয়তো সেই ক্ষতি পূরণ করা যাবে। কিন্তু শোভন যদি সত্যিই গেরুয়া শিবিরে যান, সেই ধাক্কা সামাল দেওয়া মুশকিল হবে তৃণমূলের কাছে। একটা বিষয় স্পষ্ট, ভরসা করে যাঁদের মেয়রের চেয়ার দিয়েছিলেন মমতা, তাঁরাই আজ তৃণমূলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছেন।