মুকুল রায়ের পর  তৃণমূল কংগ্রেসের শক্তিশালী সাংগঠক হিসেবে পরিচিতি ছিল শুভেন্দু অধিকারীর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বীরভূম, মালদা, মুর্শিদাবাদের মত গুরুত্বপূর্ণ জেলার সাংগঠনিক দায়িত্বও দিয়েছিলেন। একটা সময় পশ্চিমাঞ্চলের তৃণমূল সাংগঠনিক দায়িত্বও ছিল তাঁর ওপর। ছত্রধর মাহাত বা জনসাধারণের কমিটির সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগও রাখতেন তিনি। ধীরে ধীরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থা ভাজন নেতা হয়ে ওঠেন। দায়িত্ব পান যুব তৃণমূল কংগ্রেসের। কিন্তু সেই দায়িত্বের মধ্যেও কী নিহীত ছিল শুভেন্দুর বিক্ষুব্ধ তৃণমূলী হয়ে ওঠার অঙ্কুর? 

কারণ শুভেন্দু অধিকারীকে সরিয়ে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যুব তৃণমূল কংগ্রেসের দায়িত্ব দেন ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। রাজনৈতিক মহলের ধারনা তারপর থেকেই কালীঘাটের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে তাঁর। যদিও সারদাকাণ্ডে মদন মিত্র নাম জড়িয়ে যাওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে পরিবহন দফতরের মত গুরুত্বপূর্ণ দফতরের মন্ত্রী করেন। তারপর সব ঠিকঠাক চললেও কালীঘাটের সঙ্গে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়ছিল কাঁথির অধিকারীদের। শুভেন্দু প্রকাশ না করলেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারণে দূরত্ব-- বলেও দাবি করেন শুভেন্দু ঘনিষ্টরা। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবকিছু সামাল দিতে শুভেন্দু অধিকারীকে একের পর এক জেলার সাংগঠনিক দায়িত্ব দিয়ে যায়। মিতভাষী শুভেন্দুও তাঁর দায়িত্ব যে সঠিকভাবে পালন করে যাচ্ছিলেন তার প্রমাণ দেয় ভোটের ফলাফল। কিন্তু ওপর থেকে সবকিছু ঠিকঠাক দেখালেও সবকিছু যে ঠিক ছিল না তা আরও একবার প্রমাণ করল মমতার মন্ত্রিসভা থেকে শুভেন্দুর ইস্তফা। 


লোকসভা ভোটের খারাপ ফলাফলের পরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়ে আসেন ভোট কুশলী প্রকান্ত কিশোরকে। আর প্রশান্ত কিশোর একের পর এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। যেখানে আরও একবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই তৃণমূল কংগ্রেসের মুখ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। টিম পিকের প্রথম কর্মসূচি ছিল দিদিকে বলো। সেই কর্মসূচি তেমনভাবে কার্যকর করেননি তৎকালীন সেঁচমন্ত্রী ও পরিবহন মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। যা নিয়ে সেই সময় দলের অন্দরেও একাধিক প্রশ্ন উঠেছিল। টিম পিকে দ্বিতীয় কর্মসূচি ছিল বাংলার গর্ব মমতা। শুভেন্দু নিজের বিধানসভা কেন্দ্রেও এই কর্মসূচিও তেমনভাবে কার্যকরী করেননি। পাল্টা পূর্ব মেদিনীপুরে অধিকারীদের প্রধান প্রতিপক্ষে অখিল গিরি ও তাঁর পুত্র সুপ্রকাশ দুটি কর্মসূচি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করেন। অধিকারীদের খাসতালুকেই এই পিতা পুত্র এই কর্মসূচি পালন করেন। 


পূর্ব মেদিনীপুরের পাশাপাশি পশ্চিম মেদিনীপুরেও অধিকারীদের প্রভাব এরাজ্যের বাসিন্দাদের অজানা নয়। তৃণমূল জন্মলগ্ন থেকে অখিল গিরি মমতা বন্ধ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থাকলেও মাঝখানে কিছুটা হলেও প্রভাব কমেছিল তাঁর। তখন অধিকারী পরিবারের ছিল এই প্রভাব বাড়ছিল। সাংসদ থেকে বিধায়ক হয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন শুভেন্দ। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী ও ভাই দীব্যেন্দু অধিকারী দুজনেই সাংসদ। আরাক ভাই  সৌমেন্দু বিধায়ক ও তাঁর ছোট ভাই হলেন কাঁথি পুরসভার চেয়ারম্যান।  দলের প্রথম সারির সৈনিক হিসেবে রাজ্যরাজনীতিতে সক্রিয় শুভেন্দু। অধিকারীরের দাপটে কিছুটা ম্লান হয়ে গেলেও দলে প্রসঙ্গিক হওয়ার চেষ্টা শুরু করে দেন অখিল গিরি। নিজের অস্বিত্ব জানান দিতে শুরু করেন তিনি। বর্তমানে  পূর্ব মেদিনীপুরের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন অখিল পুত্র সুপ্রকাশ। এখন তিনি যুব তৃণমূলের কার্যকরী সভাপতিও। পূর্ব মেদিনীপুরে দলের ভিরতে ও বাইরে গিরি পরিবারের প্রাধান্য বাড়ছে, কিছুটা হলেও অস্বস্তি বাড়াচ্ছে অধিকারী পরিবারের।  পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তৃণমূলের সভাপতি শিশির অধিকারী। বেশ কিছুদিন আগেই তাঁর মাথায় কার্যকরী সভাপতি করে বসানো হয়েছে অখিল গিরিকে। যা শুভেন্দু মেনে নিতে পারেনি বলেও ঘনিষ্ঠ মহল দাবি করছে।