উত্তরবঙ্গের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে বসে বারবার লিখে ফেলি পাহাড়, জঙ্গল নিয়ে। লেখা হয়না বাকি জায়গাগুলোর কথা। আজ সেরকমই এক জায়গার কথা মনে পড়ল। আজ থাকুক কোচবিহারের কথা।
নামের ইতিহাস দিয়েই শুরু করা যাক। 'কোচ' শব্দটির উৎপত্তি কোচ রাজবংশ থেকে আর 'বিহার' মানে তো ভ্রমণ বা বেড়ানো।  কোচ রাজার শহরে এসে ঘুরে বেড়িয়ে পর্যটকদের ভালো লাগবেই সেকথা বোধহয় জানতেন যারা নামকরণ করেছিলেন। সপ্তদশ শতাব্দীতে রচিত 'শাহজাহানাম' গ্রন্থে কোচবিহার নামটি উল্লিখিত ছিল। আর তারপরে অষ্টাদশ শতকে মেজর রেনেল-এর মানচিত্রে এই জায়গাটির নামের জায়গায় লেখা আছে 'বিহার'। ১৭৭৩ সালে ইস্ট ইন্দিয়া কোম্পানির সঙ্গে কোচবিহারের রাজার যে চুক্তি সাক্ষরিত হয় সেই চুক্তিপত্রে এই জায়গাকে 'কোচবিহার' নামে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাসের স্বাক্ষর বহন করে চলেছে এই শহর। প্রকৃতি, পরিচ্ছন্নতা ও পরিকল্পনা -এই তিনটে বৈশিষ্টই পর্যটকরা প্রত্যক্ষ করবেন এখানে এলে। অতীতকাল থেকেই এ নগর পরিকল্পিত। সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ রাজবাড়ি। ১৮৮৭ সালে মহারাজ নৃপেন্দ্র নারায়ণের রাজত্বকালে তৈরি হয়েছিল রাজবাড়ি। রোমের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার যে রোমান গথিক আদল সেই আদলে তৈরি করা হয় এই রাজবাড়ি ইঁট, বালি সুড়কি দিয়ে। আবার অনেকের মতে বাকিংহাম প্যালেসের ধাঁচে এ প্রাসাদ তৈরি হয়েছে। মহারানি গায়ত্রীদেবী এই রাজ পরিবারের মেয়ে ছিলেন। এই পরিবার নিয়ে নানা গল্প শুনতে পাওয়া যায় আজও এবং ইতিহাসের পাতায় তাই নানা কারণে, ভিন্ন পর্যায়ে উঠে এসেছে কোচবিহারের নাম এখানকার রাজ পরিবারের নাম। রাজপ্রাসাদে আছে শয়নকক্ষ, সাজ ঘর, খাওয়ার ঘর, বিলিয়ার্ড হল, গ্রন্থাগার প্রভৃতি। রাজপ্রাসাদের সামনের সবুজ ঘাসের গালিচা মোড়া বাগান ও শান্ত সরোবর। যে সরোবরে প্রাসাদের আর মেঘের ছায়া ভেসে ওঠে ।  রাজার বাড়ি ও মিউজিয়াম দেখতে সময় লাগবে। সন্ধেবেলায় আলোর সাজে রাজার বাড়ি দেখতে এলে দেখে যেতে পারেন লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো।  
রাজবাড়ির পড়েই যে দ্রষ্টব্য স্থানের কথা আসে তা হল মদনমোহন মন্দির,  রাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ তৈরি করিয়েছিলেন এই মন্দির। ১৮৮৫- ৮৭ সাল নাগাদ মন্দির স্থাপিত হয়।  রাস পূর্ণিমার সময় এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে বিরাট উৎসব আয়োজিত হয়। রাসের মেলায় বহু জায়গার মানুষ আসেন কোচবিহারে। স্নিগ্ধ সফেদ এই মন্দিরের উলটো দিকেই রয়েছে বৈরাগী দিঘি আর দিঘির পাড় ঘেঁষে সারিবদ্ধ গাছ। 
এরপর যাওয়া যায় সাগর দিঘির পাড়ে। দিঘির নামকরণ যে এর বিপুল আকারের জন্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিকেলের আলোয় এই দিঘির ধারে অপেক্ষা করাই যায় সূর্যাস্তের জন্য। শীতের সময়ে এখানে প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসে। 
পরের দিন পর্যটকরা ঘুরে আসতে পারেন বাণেশ্বর মন্দির। এখানে মূল মন্দির থেকে ১০ ফুট নীচে রয়েছে গর্ভগৃহ এবং শিবলিঙ্গ।  মন্দিরের চারপাশে অনেক জলাশয় আছে আর সেখানে অনেক কচ্ছপ দেখতে পাওয়া যায়। দোল্পূর্ণিমার দিন এই মন্দির থেকে মদনমোহন মন্দির পর্যন্ত শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। দোল ও রাস এই দুই উৎসবেই সরগরম থাকে কোচবিহার।
আগেই বলেছিলাম কোচবিহারের হাওয়ায় ইতিহাসের গন্ধ পাওয়া যায়। কোচবিহার থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে দিনহাটায় পৌঁছে সেখান থেকে যেতে হবে গোসানিমারি গ্রাম। ইতিহাসপ্রেমীরা কোচবিহারে এলে এই  গোসানিমারি গ্রামে আসতেই হবে কারন এখানেই খনন করে পাওয়া গেছে কামতাপুর রাজবাড়ির অংশ। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া জানিয়েছে এখানে মাটির তলায় আছে কামতেশ্বরী মন্দির। মন্দিরের মূল অংশ নাকি এখনও মাটির নীচে। খননের ফলে এই গ্রামেই পাওয়া গেছে মুঘল আমলের মুদ্রা।  এছাড়াও এখানকার রাজবংশীদের লৌকিক দেবতা মশান ঠাকুরের মন্দিরও দেখে নিতে পারেন পর্যটকরা যদি চান।
হাতে দুদিন সময় নিয়ে কোচবিহারে এলে দেখা হয়ে যাবে এই সবই। 

কোথায় থাকবেন- এখানে অনেক লজ ও হোটেল আছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের টুরিস্ট লজ -এ থাকতে চাইলে অনলাইনে বুক করে নিতে পারেন। 

কীভাবে যাবেন- উত্তরবঙ্গগামী যে ট্রেনগুলো কোচবিহারে যায় সেরকম যেকোনও ট্রেনে করে পৌঁছে যান কোচবিহার।