Asianet News BanglaAsianet News Bangla

ঠাকুর দালানে ভোগের নামে পৌঁছত বিপ্লবীদের জন্য খাবার, চন্দননগরের হরিহর শেঠের বাড়ির দুর্গাপুজো আজও উল্লেখযোগ্য

  • চন্দননগরের রূপকার ছিলেন হরিহর শেঠ
  • আধুনিক চন্দননগর গঠনে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য
  • চন্দননগরের প্রথম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ছিলেন তিনি
  • শরৎচন্দ্র চট্ট্যোপধ্ধ্যয়, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় , জগদীশচন্দ্র বসু এই পুজোয় এসেছিলেন
Know about the untold facts of the Durga Puja of Harihar Seth's house in Chandannagar BDD
Author
Kolkata, First Published Oct 14, 2020, 2:40 PM IST
  • Facebook
  • Twitter
  • Whatsapp

উত্তম দত্ত, হুগলি-  হুগলি জেলায় প্রচুর ধরনের পুজো হয়। তার মধ্যে বেশ কিছু প্রাচীন জমিদার বাড়ীর পুজোও আছে । আমরা যদি চন্দননগরের কথা বলি, তবে সেখানে পাবো শেঠ বাড়ীর ঐতিহ্যশালী দুর্গাপুজো । যে পুজোর শুরু ৫০০ বছরেরও আগে। আর চন্দননগরের কথা মনে আসতেই প্রথমেই যেটা মনে ভাসে সেটা হল জগদ্ধাত্রী পুজো। কিন্তু জগদ্ধাত্রী পুজোর জন্য চন্দননগর প্রসিদ্ধি লাভ করলেও, শেঠ বাড়ির দুর্গা পুজো দেখতে এখনও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষজন আসেন। একটু ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যাবে চন্দননগরের রূপকার ছিলেন হরিহর শেঠ। একদিকে ব্যবসায়ী , অন্যদিকে সাহিত্যিক , সমাজসেবী। আধুনিক চন্দননগর গঠনে যার ভূমিকা অনস্বীকার্য। 

হরিহর শেঠের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চন্দননগরের পালপাড়ায়। পিতার নাম নিত্যগোপাল শেঠ আর মায়ের নাম কৃষ্ণভামিনী দেবী। তৎকালীন শিক্ষিত বঙ্গসমাজে হরিহর শেঠ ছিল অন্যতম একটি নাম। 'প্রবাসী', 'ভারতবর্ষ', 'মাসিক বসুমতী' 'বঙ্গবাণী', 'ভারতী', 'বিচিত্রা' 'প্রদীপ' প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন তিনি। চন্দননগরের বিভিন্ন সমাজের সেবামূলক বহু কাজ করতেন। ফরাসি সরকার প্রবর্তিত উপনিবেশ শহর চন্দননগর ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ১৯ শে জুনের গণভোট স্বাধীন হওয়ার পর তিনি প্রথম সভাপতি মনোনীত হন। আধুনিক চন্দননগর গঠনে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে মায়ের নাম অনুসারে চন্দননগরে প্রথম মহিলা উচ্চ বিদ্যালয় 'কৃষ্ণভামিনী নারীশিক্ষা মন্দির' গঠন করেন। বিশাল পাঠাগার সঙ্গে নাট্যমঞ্চ নিয়ে 'নিত্যগোপাল স্মৃতি মন্দির', অঘোরচন্দ্র শেঠ প্রাইমারি স্কুল-সহ দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় তিনি স্থাপন করেন। 

Know about the untold facts of the Durga Puja of Harihar Seth's house in Chandannagar BDD

১৯৪৯ সালের ২৯ জুন গণভোটে চন্দননগর স্বাধীন হয়। ফরাসি সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করে সেই সময় স্বাধীন চন্দননগরের প্রথম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ছিলেন হরিহর শেঠ । ফরাসি সরকারের তরফ থেকে তিনি পেয়েছিলেন দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সন্মান ' লিজিয়ন ওফ অনার'। হরিহর শেঠের দান চন্দননগরের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে । তাঁর বিখ্যাত অট্ট্যলিকা আজ হেরিটেজ সম্পত্তি। শোনা যায় বৈবাহিক সূত্রে শ্বশুরবাড়ী থেকে পালপাড়া এলাকায় ওই পুজোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন হরিহর শেঠ। তাঁকে যোগ্য সংগতি দিয়েছিলেন তাঁর ভাই স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা বিপ্লবী অনুশীলন সমিতির সদস্য দুর্গাচরণ শেঠ। আজও এই পুজো নিষ্ঠা সহকারে করেন শেঠ পরিবারের সদস্যরা। কথিত আছে ওই দুর্গাপুজো দেখতে ওই বাড়ী এসেছেন শরৎচন্দ্র চট্ট্যোপধ্ধ্যয়, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় , জগদীশ চন্দ্র বসু। 

Know about the untold facts of the Durga Puja of Harihar Seth's house in Chandannagar BDD

এই পুজোর বিশেষ বৈশিষ্ট হল ডাকের সাজে মায়ের স্নিগ্ধ মূর্তি। প্রতি বছর কাঠামো একই থাকে, তার ওপর মাটি দিয়ে মূর্তি গড়া হয়। প্রচলিত প্রথা পুজোর উপকরণ জোগাড় করা এবং নৈবেদ্য সাজানো সবই করেন বাড়ির মহিলারা। সিঁদুর খেলার জন্য বিখ্যাত এই পুজো। হরিহর শেঠের বংশধর গৌতম শেঠ জানান, তৎকালীন সমাজে পর্দাপ্রথা ছিলো বাড়ির মহিলাদের। তাই অনেক কিছু বিধি-নিষেধ ছিল। হরিহর শেঠ ছিলেন মুক্ত মনের মানুষ। তিনি ঠিক করেছিলেন বাড়ির মহিলারাই থাকবেন এই দুর্গাপুজোর পুরোভাগে । তাই পুজোর আচার আয়োজন বাড়ির মহিলারা করতেন। এই বাড়ির সদস্য গৌতম শেঠ জানিয়েছেন, তিনি তাঁর পূর্বপুরুষ দের মুখে শুনেছেন ওই বাড়ির দুর্গাদালানে বাড়ির মহিলারা বিভিন্ন খাবার করে রেখে আসতেন । কারণ প্রচুর বিপ্লবী লুকিয়ে ওই দুর্গাদালানে আসতেন। আর শেঠ বাড়ির মহিলাদের গোপন  দায়িত্ব ছিল তাঁদের জন্য রান্না করে খাদ্যের যোগান দেওয়া। 

দুর্গাপুজোয় অষ্টমীতে হত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রেওয়াজ ছিল, বিসর্জনের দিন জেলেরা এসে মাকে কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে গঙ্গায় বিসর্জন দেবেন। তবে একালে আর ওই নিয়ম চলে না, পাড়ার লোকেরাই কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে প্রতিমা নিরঞ্জন করেন। তবে এই বছর করোনা আবহে নিয়মের অনেকটাই কাটছাঁট করতে হচ্ছে বলে গৌতম বাবু জানান , যেমন প্রতিমা এবারে আকারে ছোটো হচ্ছে যাতে সহজে বহন করা যায়। সরকারি বিধিনিষেধ মেনে ছাদ থাকছে উন্মুক্ত। জনসমাগম কম করার জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্টান বাতিল করা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে প্রতিমা নিরঞ্জন হবে এবার ট্রলিতে। তবে আচার বিধি সব মেনেই হবে পুজো। পুজোর খরচা কমিয়ে সেই অর্থ অন্য কোনও সামাজিক উদ্দেশ্যে  ব্যবহৃত হবে বলে জানিয়েছেন গৌতম শেঠ।

Follow Us:
Download App:
  • android
  • ios