বয়স ৩০ পেরোতেই মাথায় পাক ধরেছে? পার্লারে গিয়ে মাসে মাসে কালো, বার্গেন্ডি, ব্রাউন করছেন? কিন্তু জানেন কি, এই শখ ডেকে আনতে পারে মারণ রোগ ক্যানসার? পাকা চুল ঢাকার আগে এই তথ্যগুলো জেনে নিন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম পাকা চুলটা চোখে পড়লেই মন খারাপ। বয়স ধরে রাখতে, কনফিডেন্ট থাকতে আমরা ছুটি পার্লারে। কালো, ব্রাউন, বার্গেন্ডি – মাসে একবার রং না করালেই নয়।
কিন্তু এই যে মাসে মাসে, বছরের পর বছর কেমিক্যাল রং চুলে লাগাচ্ছেন, এতে শরীরের ভিতরে কী হচ্ছে? গুগল করলেই দেখবেন ‘হেয়ার ডাই ক্যানসার’ লিখে হাজার হাজার আর্টিকেল। সত্যিই কি ঝুঁকি আছে? নাকি পুরোটাই গুজব?
কী বলছে গবেষণা? ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার বা IARC বলছে, হেয়ার ড্রেসার বা নাপিত যারা রোজ রোজ কেমিক্যাল ডাই ঘাঁটেন, তাঁদের ব্লাডার ক্যানসারের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি। কারণ তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে কেমিক্যালের সংস্পর্শে থাকেন।
সাধারণ মানুষ যারা বাড়িতে বা পার্লারে রং করান, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কতটা? ২০১৯ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ, আমেরিকার এক বিশাল স্টাডিতে ৪৬,০০০ মহিলার উপর পরীক্ষা হয়। দেখা যায়, যারা নিয়মিত পার্মানেন্ট হেয়ার ডাই ব্যবহার করেন, বিশেষ করে গাঢ় রং – কালো, ব্রাউন – তাঁদের ব্রেস্ট ক্যানসারের ঝুঁকি ৯% বেশি। আফ্রিকান-আমেরিকান মহিলাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি ৬০% পর্যন্ত বেড়েছে।
কোন কেমিক্যালগুলো ভিলেন? ১. পিপিডি বা প্যারাফেনাইলেনডায়ামিন: পার্মানেন্ট কালো ও গাঢ় বাদামি রঙে থাকে। এটা সবচেয়ে বেশি অ্যালার্জি করে। ইউরোপের অনেক দেশে এর মাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। পিপিডি শরীরের DNA ক্ষতি করতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়। ২. অ্যামোনিয়া: চুলের কিউটিকল খুলে রং ঢোকায়। শ্বাসের সাথে গেলে ফুসফুসের ক্ষতি, চোখ জ্বালা করে। ৩. রিসোর্সিনল: হরমোনের ব্যালেন্স নষ্ট করতে পারে। থাইরয়েডের সমস্যা ডেকে আনে। ৪. কোল টার: কিছু ডাইয়ে থাকে। IARC এটাকে ‘কার্সিনোজেনিক’ বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী বলেছে।
কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি? ১. পার্লার কর্মী ও নাপিত: রোজ ৮-১০ ঘণ্টা কেমিক্যাল ঘাঁটেন। গ্লাভস না পরলে, মাস্ক না পরলে ব্লাডার, ফুসফুস ও ব্লাড ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে। ২. মাসে ১ বারের বেশি রং করেন যারা: বছরে ১২ বারের বেশি পার্মানেন্ট ডাই ব্যবহার করলে ঝুঁকি বাড়ে। ৩. ১৬ বছর বয়সের আগে শুরু করেছেন: কম বয়সে শুরু করলে শরীরে কেমিক্যাল জমার সময় বেশি পায়। ৪. গাঢ় রং ব্যবহারকারী: কালো, ডার্ক ব্রাউন, বার্গেন্ডিতে কেমিক্যাল বেশি। ব্লন্ড বা হালকা রঙে তুলনায় কম। ৫. বাড়িতে নিজে রং করেন: পার্লারের মতো ভেন্টিলেশন থাকে না। রং স্ক্যাল্পে বেশি সময় রাখেন। হাতে গ্লাভস পরেন না।
তার মানে কি রং করা বন্ধ করে দেব? না। আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘যোগসূত্র’ আছে, কিন্তু ‘সরাসরি কারণ’ এখনও ১০০% প্রমাণিত নয়। মানে রং করলেই ক্যানসার হবে, এমন নয়। তবে সাবধান থাকা ভালো।
ঝুঁকি কমাতে ৭টি সোনার নিয়ম মানুন: ১. PPD ফ্রি, অ্যামোনিয়া ফ্রি ডাই বাছুন: এখন অনেক ব্র্যান্ড ‘অর্গানিক’, ‘ন্যাচারাল’, ‘পিপিডি ফ্রি’ কালার আনছে। দাম একটু বেশি, কিন্তু নিরাপদ। ইন্ডিগো, হেনা বেসড কালার ট্রাই করুন। ২. প্যাচ টেস্ট মাস্ট: রং করার ৪৮ ঘণ্টা আগে কানের পিছনে বা কনুইয়ে লাগিয়ে দেখুন। চুলকানি, লাল হলে ওই প্রোডাক্ট বাতিল। ৩. স্ক্যাল্পে লাগাবেন না: চেষ্টা করুন গোড়া থেকে ১ ইঞ্চি ছেড়ে রং লাগাতে। স্ক্যাল্প দিয়ে কেমিক্যাল রক্তে মেশে। ৪. সময় মেনে চলুন: প্যাকেটে ৩০ মিনিট লেখা থাকলে ৪৫ মিনিট রাখবেন না। ‘বেশি রাখলে বেশি রং ধরবে’ – ভুল ধারণা। ৫. গ্লাভস পরুন, ঘর খোলা রাখুন: নিজে করলে জানালা খুলে, ফ্যান চালিয়ে করুন। হাতে গ্লাভস, মুখে মাস্ক। ৬. গ্যাপ দিন: দুটো কালারের মধ্যে অন্তত ৬-৮ সপ্তাহ গ্যাপ দিন। বছরে ৫-৬ বারের বেশি নয়। ৭. সেমি-পার্মানেন্ট ট্রাই করুন: এগুলো চুলের ভিতরে ঢোকে না, উপরে কোট করে। ৬-৮ বার শ্যাম্পুতে উঠে যায়। ঝুঁকি অনেক কম।
ন্যাচারাল অপশন কী আছে? ১. মেহেন্দি + ইন্ডিগো: লালচে করতে মেহেন্দি, কালো করতে তার উপর ইন্ডিগো। ১০০% কেমিক্যাল ফ্রি। ২. কফি বা চা লিকার: হালকা ব্রাউন শেড চাইলে কাজ দেবে। তবে ২-৩ ওয়াশেই উঠে যাবে। ৩. বিট ও গাজরের রস: বার্গেন্ডি টিন্ট চাইলে মেহেন্দির সাথে মেশান।
শেষ কথা: পাকা চুল ঢাকা দোষের নয়। কনফিডেন্সের জন্য দরকার। কিন্তু মাসে মাসে গাঢ় কেমিক্যাল রং না করে ২ মাস অন্তর করুন। সম্ভব হলে অর্গানিক বা হেনা বেসড কালার বাছুন। পার্লারে গেলে ওদের বলুন PPD ফ্রি কালার দিতে।
সুন্দর দেখানোর চেয়ে সুস্থ থাকা জরুরি। পাকা চুলে স্মার্ট লুকও হয়। বলিউডের জর্জ ক্লুনি বা আমাদের অমিতাভ বচ্চনকে দেখুন। গ্রে হেয়ার এখন ফ্যাশন। ভেবে দেখবেন।


